tanaka

মার্কিন বিমান বাহিনীর এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য মিশিগানের ট্রাভার্সি শহরে মার্কিন বিমান বাহিনীর এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বিভাগের একটি এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবারের এই ঘটনায় বিমানটি...
প্রচ্ছদরাজধানীরাতের কৃত্রিম আলো কি বাড়িয়ে দিচ্ছে এডিস মশার কামড়ের সময়?

রাতের কৃত্রিম আলো কি বাড়িয়ে দিচ্ছে এডিস মশার কামড়ের সময়?

সূর্য ডোবার পর শহর যত আলোকিত হচ্ছে, ততই বদলাচ্ছে রাতের পরিবেশ। আর এর সঙ্গে এডিস মশার আচরণেও কোনো পরিবর্তন ঘটছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় বলে পরিচিত হলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক গবেষণায় সূর্যাস্তের পরও এ মশার সক্রিয় থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও কৃত্রিম আলোর কারণে মশার চলাচল ও কামড়ানোর সময়ের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে বাংলাদেশের শহরগুলোতে বাড়তে থাকা স্ট্রিটলাইট, এলইডি বাতি ও বিভিন্ন স্থাপনার কৃত্রিম আলো মানুষের এডিস মশার কামড়ের ঝুঁকির সময়সীমা বাড়াচ্ছে কি না—এখন সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

তবে ঢাকার এলইডি স্ট্রিটলাইট বা অন্য কোনো কৃত্রিম আলো সরাসরি ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়াচ্ছে—এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও পরিবেশে কৃত্রিম আলোর মাত্রার সঙ্গে এডিস মশার আচরণের সম্পর্ক নিয়ে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে ডেঙ্গু যখন রাজধানীর বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে, তখন বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সূর্যাস্তের পরও সক্রিয় এডিস

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন ধরে এডিস মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। তার ভাষ্য, রাতে এডিস মশার সক্রিয়তার বিষয়টি এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তিনি জানান, রাতে এডিস মশার ঘনত্ব কিছুটা কম থাকলেও তারা কামড়ায়। এতদিন প্রচলিত ধারণা ছিল, এডিস মশা মূলত সকাল ও বিকেলে বেশি কামড়ায়।

২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক কবিরুল বাশার ও তার সহকর্মীরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯০৪টি মশা সংগ্রহ করে গবেষণা করেন। বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মশার সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে তারা দেখতে পান, সন্ধ্যার পরও এডিস মশা সক্রিয় থাকে এবং রাত ৯টার দিকেও তাদের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

তবে ওই গবেষণায় কৃত্রিম আলোর মাত্রার ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকার মশার আচরণ তুলনা করা হয়নি। ফলে রাতের কৃত্রিম আলো এডিস মশার সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে কি না, তা ওই গবেষণার ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

ঢাকার রাতও এখন আগের চেয়ে বেশি আলোকিত

গত কয়েক বছরে ঢাকার রাতের পরিবেশও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। Environmental Sciences Europe-এ প্রকাশিত ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভিআইআইআরএস স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঢাকায় রাতের কৃত্রিম আলোর বিস্তার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে উঠে এসেছে। গবেষকদের হিসাবে, শহরটির কৃত্রিম রাতের আলো প্রতিবছর প্রায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে বেড়েছে।

বিমানবন্দর, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলক বেশি আলোর ঘনত্ব দেখা গেছে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরেও পুরোনো স্ট্রিটলাইটের পরিবর্তে উজ্জ্বল সাদা এলইডি বাতির ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক এলাকা, ভবন ও জনসমাগমস্থলগুলোও আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় আলোকিত থাকছে।

তবে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের তথ্য কেবল শহরে রাতের কৃত্রিম আলোর বিস্তার বাড়ার বিষয়টি নির্দেশ করে। এর সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করে না।

কৃত্রিম আলো কীভাবে মশার আচরণ বদলাতে পারে?

আন্তর্জাতিক কিছু গবেষণায় কৃত্রিম আলোর কারণে মশার রাতের সক্রিয়তায় পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। ২০২০ সালের একটি পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশার প্রায় ৮২ শতাংশ দিনের বেলায় রক্ত পান করেছিল। রাতে এ হার ছিল ২৯ শতাংশ। কিন্তু মাত্র ৩০ মিনিট সাদা আলোর সংস্পর্শে রাখার পর রাতে রক্ত পান করার হার বেড়ে প্রায় ৫৯ শতাংশে পৌঁছায়।

এ ছাড়া ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির মশার ওপর পরিচালিত একটি মাঠপর্যায়ের গবেষণায় কৃত্রিম আলোর দূষণ বেশি এমন এলাকায় রাতে মশার সক্রিয়তা তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে অতিরিক্ত গরম দিনের পর এ প্রবণতা আরও স্পষ্ট ছিল।

তবে এসব গবেষণার ফল সরাসরি বাংলাদেশের পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। মশার প্রজাতি, আবহাওয়া, তাপমাত্রা, পরিবেশ এবং কৃত্রিম আলোর ধরন ও মাত্রায় দেশভেদে পার্থক্য রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন রেজা খান বলেন, কৃত্রিম আলো রাতে প্রাণীর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ প্রভাব প্রজাতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো মশা বা প্রাণীর ওপর আলোর প্রভাব কতটা, তা জানতে সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে প্রয়োজন আরও গবেষণা

বাংলাদেশে এ বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিবেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার সক্রিয়তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আলোর উজ্জ্বলতা, তরঙ্গদৈর্ঘ্য, রঙের তাপমাত্রা, কতক্ষণ আলো জ্বলছে এবং রাতের তাপমাত্রার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

গবেষণা ছাড়া বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য শহরের কৃত্রিম আলোকে দায়ী করা যাবে না। তবে সূর্যাস্তের পরও শহরগুলো যখন দীর্ঘ সময় আলোকিত ও কর্মচঞ্চল থাকে, তখন এডিস মশার আচরণ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

অর্থাৎ, এডিস মশা শুধু দিনের বেলাতেই সক্রিয়—এমন ধারণার পাশাপাশি রাতের সক্রিয়তাকেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কৃত্রিম আলো এই আচরণে কতটা ভূমিকা রাখছে, তার উত্তর পেতে এখন প্রয়োজন বাংলাদেশের বাস্তব পরিবেশভিত্তিক আরও গবেষণা।