tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকউত্তর কোরিয়ার পরমাণু পরীক্ষার পর শনাক্ত ১,৩৯৯ ভূমিকম্প

উত্তর কোরিয়ার পরমাণু পরীক্ষার পর শনাক্ত ১,৩৯৯ ভূমিকম্প

উত্তর কোরিয়ার পুংগিয়ে-রি পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশে ২০১৭ সালের পর থেকে ভূমিকম্পের সংখ্যা ও মাত্রা বেড়েছে। বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির সর্বশেষ ও সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার পর ওই এলাকায় এক হাজার ৩৯৯টি ভূমিকম্প শনাক্ত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের গবেষকেরা ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত ভূকম্পন তরঙ্গের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ প্রবণতা শনাক্ত করেন।

উত্তর কোরিয়া ২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উত্তর হামগিয়ং প্রদেশের মাউন্ট মানতাপ এলাকায় মোট ছয়টি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এর মধ্যে ২০১৭ সালের পরীক্ষাটি ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। ওই বিস্ফোরণের ক্ষমতা আনুমানিক ১৬০ কিলোটন ছিল। বিস্ফোরণের পর ৬ দশমিক ৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয় এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের একটি স্থাপনা ধসে পড়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর ছোট মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়া অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদায় চালানো পারমাণবিক পরীক্ষাগুলোতেও এ ধরনের ভূকম্পন শনাক্ত হয়েছিল। তবে সাধারণত এসব ভূমিকম্প বিস্ফোরণের কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কমে আসে এবং পরীক্ষাস্থলের আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকে।

মাউন্ট মানতাপের ক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। গবেষণার প্রধান লেখক ও দক্ষিণ কোরিয়ার পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কোয়াং-হি কিম বলেন, ২০১৭ সালের বিস্ফোরণের পর ভূমিকম্পের প্রবণতা এতটাই স্পষ্ট ও ধারাবাহিক ছিল যে গবেষকেরা এতে বিস্মিত হয়েছেন।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৩ সালে উত্তর কোরিয়ার তৃতীয় পারমাণবিক পরীক্ষার পর প্রথম ভূমিকম্প শনাক্ত হয়। তবে ২০১৭ সালের ষষ্ঠ ও সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণের পর ভূকম্পনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে ভূমিকম্পের সংখ্যা ও মাত্রা আরও বাড়তে থাকে।

তবে এসব ভূমিকম্পের বেশির ভাগই ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল। গবেষকেরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ২ থেকে ৩-এর মধ্যে এবং এগুলো অপেক্ষাকৃত কম গভীরতায় সংঘটিত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, কোরীয় উপদ্বীপ সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সীমানায় অবস্থিত নয়। এ কারণে জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের তুলনায় এখানে স্বাভাবিক ভূকম্পন তুলনামূলকভাবে কম।

গবেষণায় মাউন্ট মানতাপের নিচে আগে থেকেই থাকা ‘ইন্ট্রাপ্লেট’ ফল্ট বা ভূত্বকের প্রাচীন ফাটলেরও সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, ২০১৭ সালের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণ এসব ফাটলের অন্তত দুটিকে সক্রিয় হওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মাউন্ট মানতাপ একটি বড়, খাড়া ও অসম আকৃতির পাহাড়। এর নিচে থাকা কিছু ফাটল অন্যগুলোর তুলনায় ভেঙে পড়ার কাছাকাছি অবস্থায় ছিল। পারমাণবিক বিস্ফোরণ সেগুলো সক্রিয় করার ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

গবেষণায় অংশ না নেওয়া শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূভৌত বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক সানইয়ং পার্ক বলেন, সাধারণত ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্প দ্রুত কমে যায়। কিন্তু মাউন্ট মানতাপে ভূকম্পন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে বেড়েছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

তার মতে, বিস্ফোরণের ফলে বিপুল পরিমাণ শিলা ভেঙে গিয়ে নতুন ফাটল তৈরি হতে পারে। এসব ফাটলের মধ্য দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি প্রবেশ করলে শিলার ভেতরের চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে ফল্টগুলো সহজেই সরে গিয়ে ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। তবে গবেষণায় ভূগর্ভস্থ পানির ভূমিকা সরাসরি পরীক্ষা করা হয়নি।

গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, শনাক্ত করা এক হাজার ৩৯৯টি ভূমিকম্পই ওই এলাকার প্রকৃত মোট সংখ্যা নয়। একাধিক ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে শনাক্ত হওয়া ঘটনাগুলোই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাত্র একটি বা দুটি কেন্দ্র থেকে পাওয়া সংকেতগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকৃত ভূমিকম্পের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

গবেষকদের এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্র পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ভূকম্পন এবং স্বাভাবিক ভূ-গাঠনিক কারণে হওয়া ভূমিকম্পের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

গবেষক কিম জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের পর পুংগিয়ে-রি এলাকায় নতুন কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ তাদের হাতে নেই। গবেষক দল উত্তর কোরিয়ার পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগও পায়নি। এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্যও তাদের হাতে ছিল না।

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের একটি দলকে পুংগিয়ে-রি কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে টানেল বিস্ফোরণের মাধ্যমে পরীক্ষাকেন্দ্র ধ্বংসের দৃশ্য দেখিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ২০২২ সালের মার্চ থেকে দেশটি পরীক্ষাকেন্দ্রের কিছু টানেল পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে। ২০২৫ সালের মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেছে।

এদিকে পরীক্ষাকেন্দ্রের আশপাশে বসবাসকারী উত্তর কোরীয়দের মধ্যে বিকিরণের প্রভাবের সম্ভাব্য লক্ষণ নিয়েও দক্ষিণ কোরিয়ায় গবেষণা হয়েছে। তবে এসব লক্ষণের কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি।

সূত্র: সিএনএন