tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকযে দ্বীপে মানুষের চেয়ে বিড়ালের সংখ্যা বেশি

যে দ্বীপে মানুষের চেয়ে বিড়ালের সংখ্যা বেশি

জাপানের ছোট্ট দ্বীপ আওশিমা। ‘ক্যাট আইল্যান্ড’ বা বিড়ালের দ্বীপ নামে পরিচিত এই জনপদে একসময় মানুষের বসতি ছিল বেশ জমজমাট। সময়ের সঙ্গে মানুষের সংখ্যা কমেছে, অন্যদিকে বেড়েছে বিড়ালের আধিক্য। এভাবেই আওশিমা পরিচিতি পেয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিড়াল-অধ্যুষিত দ্বীপ হিসেবে।

যেভাবে বিড়ালের দ্বীপ হয়ে উঠল আওশিমা

একসময় আওশিমার বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকা ছিল মাছ ধরা। মৎস্যজীবীদের জীবন ও জীবিকা ঘিরেই গড়ে উঠেছিল দ্বীপটির অর্থনীতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেখানে প্রায় ৯০০ মানুষের বসবাস ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সে সময় মাছ ধরার নৌকা ও জালে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্বীপে বিড়াল আনা হয়। পরে অনুকূল পরিবেশ ও খাবারের সহজলভ্যতায় বিড়ালের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

অন্যদিকে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনযাপনের আশায় দ্বীপের অনেক বাসিন্দা জাপানের মূল ভূখণ্ডে চলে যান। ফলে ক্রমেই কমতে থাকে মানুষের সংখ্যা। একপর্যায়ে জনবসতির তুলনায় বিড়ালের আধিক্য দ্বীপটির বিশেষ পরিচয়ে পরিণত হয়।

পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে বিড়াল

আওশিমার বিড়ালদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। জাপানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যেমন পর্যটকেরা আসেন, তেমনি বিদেশি পর্যটকদেরও আগ্রহ রয়েছে এই দ্বীপকে ঘিরে।

দ্বীপের ঘাট, বাড়ির আঙিনা ও সরু পথজুড়ে বিড়ালদের অবাধ বিচরণ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কিছু বিড়াল মানুষের কাছে এগিয়ে আসে, আবার কিছু নিজেদের মতো ঘুরে বেড়ায়।

তবে আওশিমার পরিচিতি শুধু বিড়ালকেন্দ্রিক পর্যটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দ্বীপটির জনসংখ্যা হ্রাস জাপানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর সামাজিক বাস্তবতাকেও তুলে ধরে। কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং তরুণদের শহরমুখী হওয়ার কারণে অনেক ছোট দ্বীপ ও গ্রামীণ জনপদে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা কমছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বয়স্ক মানুষের অনুপাত।

বিড়ালের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ

বিড়ালের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্বাস্থ্য, খাবার ও পরিচর্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালে আওশিমায় বিড়ালের প্রজনন নিয়ন্ত্রণে বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি নেওয়া হয়। এর ফলে নতুন বিড়ালছানার জন্ম কমানোর উদ্যোগ জোরদার হয়।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে একসময় দ্বীপটিতে প্রায় ২০০টি বিড়াল থাকার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে আনুমানিক ৮০টি বিড়াল সেখানে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এই সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।

দ্বীপের অবশিষ্ট বিড়ালগুলোর দেখাশোনায় স্থানীয় বাসিন্দারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁদের মধ্যে নাওকো কামিমোতো অন্যতম। বয়স বাড়লেও তিনি ও তাঁর স্বামী নিয়মিত বিড়ালগুলোকে খাবার দেন। কোনো বিড়াল অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থাও করেন।

বিড়ালের দ্বীপের আড়ালে অন্য গল্প

আওশিমার মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বিড়ালের আধিক্য দ্বীপটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। তবে এই পরিচিতির আড়ালে রয়েছে জনসংখ্যা সংকট, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় জীবনধারা টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ।

পর্যটকদের কাছে আওশিমা বিড়াল দেখার আকর্ষণীয় গন্তব্য হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য দ্বীপটির দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা, বয়স্ক মানুষের যত্ন এবং প্রাণীগুলোর পরিচর্যা গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।

সব মিলিয়ে আওশিমা শুধু বিড়ালের আধিক্যের জন্যই ব্যতিক্রমী নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং একটি ছোট জনপদের বিবর্তনেরও অনন্য উদাহরণ।