tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশক্রীড়া প্রতিযোগিতার নামে পাহাড় ভ্রমণ, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিতর্ক

ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নামে পাহাড় ভ্রমণ, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিতর্ক

  1. ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে কুমিল্লায় গিয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ একদল কর্মকর্তার খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে বেড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। সফরসঙ্গী এক কর্মকর্তার ফেসবুকে প্রকাশিত ভ্রমণের ভিডিও ঘিরে বিষয়টি সামনে আসার পর সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা অনুপস্থিত থাকায় দাপ্তরিক কার্যক্রম ও সেবা নিতে আসা মানুষের ভোগান্তি নিয়েও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

    অভিযোগ অনুযায়ী, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরীর নেতৃত্বে কর্মকর্তাদের একটি দল দুটি মাইক্রোবাসে করে কুমিল্লা থেকে পাহাড়ি এলাকায় যায়। এ সফরের জন্য বোর্ডের ক্রীড়া তহবিল থেকে অগ্রিম দেড় লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

    তবে পাহাড় ভ্রমণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান। তাঁর দাবি, তিনি কুমিল্লার আশপাশের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

    ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে কুমিল্লা সফর

    সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া সমিতির উদ্যোগে এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের শারীরিক শিক্ষা বিভাগ ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের যৌথ ব্যবস্থাপনায় গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা-২০২৬-এর চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। ৬ অক্টোবর ছিল প্রতিযোগিতার উদ্বোধন এবং ১০ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠান।

    এতে অংশ নেওয়ার জন্য রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান একটি অফিস আদেশ জারি করেন। নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর রাজশাহী থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়ে ৬ অক্টোবর শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা ছিল তাঁর। পরবর্তী তিন দিন কুমিল্লায় অবস্থান করে ১০ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠানের পর রাজশাহীতে ফেরার পরিকল্পনা ছিল।

    সফরসঙ্গী হিসেবে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইফফাত জেরীন, কলেজ পরিদর্শক মাহবুব হাসান, বিদ্যালয় পরিদর্শক শামীম হাসান, উপপরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) মো. ইব্রাহিম, প্রোগ্রামার মাইনুল অর রশিদসহ বিভিন্ন বিভাগের মোট ১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

    কুমিল্লা থেকে পাহাড়ে যাওয়ার অভিযোগ

    সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দুটি মাইক্রোবাসে করে কর্মকর্তারা কুমিল্লায় পৌঁছান এবং ৬ অক্টোবর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তবে পরদিন ৭ অক্টোবর সকালে তাঁদের একটি দল রাঙামাটির সাজেকের উদ্দেশে যাত্রা করে। দুপুরে সেখানে পৌঁছানোর পর সাজেকসহ রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন তাঁরা। রাতে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে অবস্থান করেন বলেও জানা গেছে।

    অভিযোগ রয়েছে, বহরে থাকা উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জাহিদুর রহিম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সাজেক ভ্রমণের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এরপর রাজশাহীতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর সফরসূচি পরিবর্তন করে কর্মকর্তারা নির্ধারিত সমাপনী অনুষ্ঠানের আগেই ফিরে আসেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

    সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর সকালে খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। ওই রাতে ঢাকায় বোর্ডের গেস্ট হাউসে অবস্থানের পর ৯ অক্টোবর সকালে দুই দফায় রাজশাহীর উদ্দেশে যাত্রা করেন।

    সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন

    বোর্ডের একটি সূত্র দাবি করেছে, সরকারি সফর হিসেবে দেখিয়ে ক্রীড়া তহবিল থেকে অগ্রিম দেড় লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। সেই অর্থের কতটুকু নির্ধারিত কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে এবং পাহাড় ভ্রমণের সঙ্গে সরকারি অর্থের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

    এ ছাড়া জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য গঠিত দলে ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত না করে পরীক্ষা, হিসাব ও নিরীক্ষা, প্রোগ্রামিং এবং ভাণ্ডার শাখার কর্মকর্তাদের নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও আলোচনা চলছে।

    তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সফরের ব্যয় বিবরণী, দাপ্তরিক অনুমোদন, যাতায়াতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

    শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে সেবায় বিঘ্নের অভিযোগ

    চেয়ারম্যানসহ বোর্ডের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা একই সময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

    বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রউফকে চেয়ারম্যানের রুটিন দায়িত্বের পাশাপাশি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগ, বিদ্যালয় পরিদর্শক এবং কলেজ পরিদর্শকের দায়িত্বও সামলাতে হয় বলে জানা গেছে। এতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি হয় এবং সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা ভোগান্তিতে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোর্ডের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সফরকে কেন্দ্র করে সরকারি খরচে আনন্দভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি আলোচনায় এলে সফর সংক্ষিপ্ত করা হয়।

    যা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা

    পাহাড় ভ্রমণের অভিযোগ অস্বীকার করে চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী বলেন, তিনি পাহাড়ে যাননি; বরং কুমিল্লা শহরের আশপাশের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন। সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগও তিনি নাকচ করেন। তাঁর দাবি, জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা অংশ নিয়ে থাকেন এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে অধস্তন কর্মকর্তারা দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করেছেন।

    অন্যদিকে, বহরে থাকা এক কর্মকর্তা চেয়ারম্যানসহ সবার পাহাড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

    সাজেক ভ্রমণের ভিডিও প্রকাশকারী উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জাহিদুর রহিম বলেন, ‘মানুষের কি ব্যক্তিগত জীবন থাকতে পারে না? কেউ কি ঘুরতে যেতে পারবে না?’

    কলেজ পরিদর্শক মাহবুব হাসান পাহাড় ভ্রমণের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ১০ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও তাঁরা ৯ অক্টোবর রাজশাহী ফিরে এসেছেন বলে স্বীকার করেন।

    বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. আব্দুর রউফ বলেন, কুমিল্লা বোর্ডের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কর্মকর্তারা গিয়েছিলেন বলে তিনি জানতেন। তাঁদের কুমিল্লায় অবস্থান করার কথা জানানো হয়েছিল। কেউ পাহাড়ে গিয়ে থাকলে তা তাঁর অজান্তে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

    সচিব আরও বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তাঁদের জবাব সন্তোষজনক না হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

    তদন্ত ও জবাবদিহি জরুরি

    সরকারি অর্থে পরিচালিত কোনো সফরের উদ্দেশ্য, ব্যয় এবং অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি অর্থের অপব্যবহার হয়েছে কি না, সফরের অনুমোদিত কর্মসূচি অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে নাগরিক সেবায় বিঘ্ন ঘটেছে কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।

    অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।