গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনাও। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) প্রকাশিত জানুয়ারি মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও নিজেদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতি মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এমএসএফ। সংস্থাটির তথ্যমতে, জানুয়ারি মাসে মব বা গণপিটুনির ২৮টি ঘটনা ঘটেছে, যাতে নিহত হয়েছেন ২১ জন। আগের মাস ডিসেম্বরের ২৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১০ জন।
এমএসএফ মনে করে, গণপিটুনিতে নিহত ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতারই প্রতিফলন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হত্যা করা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ এবং এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে মোট ৫৭টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৪৮টি। অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বৃদ্ধিকে সমাজে সহিংসতা, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে এমএসএফ।
কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। ডিসেম্বরে যেখানে ৯ জন মারা গিয়েছিলেন, জানুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ জনে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দুটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে একজন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের সংখ্যা জানুয়ারিতে কমে এলেও সরকার পতনের পর সংঘটিত হত্যা ও সহিংসতার ঘটনায় শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারিতে নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ১২০ এবং অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ১১০ থেকে বেড়ে ৩২০-এ দাঁড়িয়েছে। এমএসএফের মতে, এটি আইনগত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইঙ্গিত দেয়।
রাজনৈতিক সহিংসতাও বেড়েছে জানুয়ারিতে। ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ এবং নিহতের সংখ্যা ১ থেকে বেড়ে ৪ জন হয়েছে। এমএসএফ বলছে, এ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া ক্রমেই প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জানুয়ারি মাসে প্রতিমা ভাঙচুর, বাড়িঘর ভাঙচুর ও মামলাসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি, যেখানে ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৪টি।
সবশেষে এমএসএফ জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও জটিল, সহিংস ও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সূচকেই ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারাবাহিক প্রভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।



