মা মুঝে কুচ খানে কো দো! মুঝে ভুখ লাগা। মাইনে সুবাহ সে কুচ নেহি খায়া…’—মায়ের কোল জড়িয়ে হিন্দিতে এমন করুণ অনুরোধ করছিল সাত বছরের শিশু নুরানী আফসানা। ঢাকার পথে হাঁটতে হাঁটতে যদি হঠাৎ এমন কণ্ঠ শুনে থমকে যান কেউ, অবাক হবেন না—কারণ এ গল্প এক ভাসমান জীবনের, পরিচয়হীন বাস্তবতার।
রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানের পাশে দেখা মেলে এমনই এক সংগ্রামী মায়ের—নাদিরা বেগম। পিতৃহীন দুই সন্তানকে নিয়ে কোনো মতে বেঁচে আছেন তিনি। না আছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, না নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। দিনে পানি বিক্রি করে যা পান, তা দিয়েই রাতের খাবার জোটানোর চেষ্টা।
হারানোর গল্প
প্রায় দেড় যুগ আগে বাবা-মাকে হারিয়ে নাদিরা ঢাকায় আসেন। অন্যের বাসায় কাজ করতেন। এক অপরিচিত নারীর প্রলোভনে ভারতের দিল্লি, সেখান থেকে কানপুরে পাড়ি জমান। সেখানে সেলিম শাহ নামের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন। এরপর মুম্বাইয়ের দাদার এলাকায় গড়ে ওঠে তাদের সংসার। জন্ম নেয় দুই সন্তান—ফরহাদ আজমী ও নুরানী আফসানা।
সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু ২০২১ সালের করোনা মহামারি কেড়ে নেয় তার স্বামীকে। মাদকাসক্ত হলেও তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা। স্বামীর মৃত্যুতে শুরু হয় বেঁচে থাকার আরেক যুদ্ধ।
নাদিরা নিজেই স্বামীর দোকানের হাল ধরেন—ফুটপাতে খেলনা ও গহনা বিক্রি করে সন্তানের ভরণপোষণের চেষ্টা চালান। ছেলেমেয়েকে স্কুলেও ভর্তি করান। কিন্তু ‘বাঙালি’ পরিচয়ের কারণে একদিন পুলিশের নজরে পড়েন। তাকে আটক করে মহারাষ্ট্র সরকার। অভিযোগ—ডকুমেন্ট নেই, পরিচয় নেই।
ছয় মাস কারাভোগের পর তাকে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আসামে নিয়ে ফেলে দেওয়া হয় সন্তানসহ। পরে বিজিবি উদ্ধার করে পাঠিয়ে দেয় নরসিংদীতে। কিন্তু ১৭ বছর পর নিজ গ্রামে ফিরে পাননি কোনো আপনজন।
এখন কোথায় ঠাঁই?
ঢাকায় ফিরে মাথা গোঁজার মতো জায়গা নেই। ফার্মগেটের ফুটপাথে দুই সন্তানকে নিয়ে রাত কাটান। সারা দিন জিয়া উদ্যানে ঘুরে ঘুরে পানি বিক্রি করেন। নেই কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র। সন্তানদের জন্ম ভারতে, তাদের জন্মসনদ ভারত সরকার নিয়ে নিয়েছে।
নাদিরা বলছিলেন,
পরিচয়হীন ভবিষ্যৎ
নাদিরার দুশ্চিন্তা এখন কেবল আজকের খাওয়া নয়—তিনি জানেন না, কাল কোথায় ঘুমাবেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তাদের নাগরিকত্ব বা নিরাপত্তা আদৌ জুটবে কিনা। এক দেশে জন্ম, আরেক দেশে নির্বাসন। মাঝখানে তিনি ও তার সন্তানেরা শুধুই ‘পরিচয়হীন’ মানুষ।
এক কাপড়ে মাসের পর মাস কাটে তার। পানি বিক্রি কম হলে সেদিনের খাবার জোটে না। নিজের ক্ষুধা সহ্য করলেও সন্তানদের মুখে অভুক্ত অবস্থায় ঘুমাতে দিতে পারেন না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন
উপসংহার
নাদিরার মতো হাজারো নারীর গল্প হয়তো হারিয়ে যায় শহরের কোলাহলে। কিন্তু প্রতিটি গল্প একেকটি জীবন্ত ইতিহাস—পরিচয়, নাগরিকত্ব আর রাষ্ট্রীয় অবহেলার এক নির্মম প্রতিফলন।



