২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন ও তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ’। একই সঙ্গে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে সংঘটিত হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় করা মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল এবং বিচার নিশ্চিত করাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (১১ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা এসব দাবি তুলে ধরেন। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি কিফায়তুল্লাহ আজহারী। সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমী, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক ও মাওলানা লোকমান মাজহারীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের শুরায়ি নেজামের (জুবায়েরপন্থি) তত্ত্বাবধানে ২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমা দুই পর্বে আয়োজনের সরকারি সিদ্ধান্ত রয়েছে। এর প্রথম পর্ব ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় পর্ব ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
তবে সংগঠনটির অভিযোগ, সম্প্রতি সাদপন্থি নেতা ওয়াসিফুল ইসলাম ও তার ছেলে ওসামা ইসলামের পক্ষ থেকে ভিন্ন তারিখ উল্লেখ করে ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়েছে। তাদের দাবি, এ ধরনের বক্তব্যের কারণে ইজতেমার আয়োজন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ওই ভিডিও বার্তায় মুফতি ওসামা ইসলাম দাবি করেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে ২০২৭ সালের ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি টঙ্গীতে সাদপন্থিদের ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি ভারতের নিজামুদ্দিন থেকে মাওলানা সাদ কান্ধলভী ওই আয়োজনে অংশ নেবেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
‘ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ’-এর নেতারা বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত ও সভার কার্যবিবরণী নিয়ে ভিন্ন কোনো বক্তব্য প্রচার হলে তা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের কোনো আশ্বাস দিয়েছেন কি না, সেটি সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো বক্তব্য প্রচার করা হয়ে থাকলে তার প্রকৃত অবস্থানও পরিষ্কার করার দাবি জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে সহিংসতার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কিছু বক্তব্য ও নির্দেশনা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছিল। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রচলিত আইন অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেন বক্তারা। তাদের মতে, অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দায় নির্ধারণ করা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর একটি পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত পয়লা বৈশাখ ও পবিত্র শবে মেরাজ-সংক্রান্ত একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গও আসে। বক্তারা ওই বক্তব্যের ধর্মীয় তাৎপর্য ও যথার্থতা নিয়ে আপত্তি জানান।
তাদের দাবি, ওই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর মুফতি ওসামা ইসলাম ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। এ বিষয়ে কোনো আইনগত অভিযোগ থাকলে তা প্রচলিত আইন ও যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তির আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা বলেন, বিশ্ব ইজতেমা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের ঐক্য, দ্বীনি পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ধর্মীয় ভাবমূর্তির সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত। তাই আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি, উসকানি কিংবা নতুন করে কোনো সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কাম্য নয়।
এ কারণে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, দায়িত্বশীল বক্তব্য দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
পাঁচ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে পাঁচটি দাবি তুলে ধরা হয়—
১. ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করে আইন অনুযায়ী চার্জশিট দাখিল ও বিচার নিশ্চিত করা।
২. ২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন নিয়ে বিভ্রান্তিকর ভিডিও বার্তা প্রচারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে ওয়াসিফুল ইসলাম ও ওসামা ইসলামের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক তথ্য বা সহিংসতার আহ্বান প্রচারের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৪. অতীতের ইজতেমা ময়দানের সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং আহতদের ন্যায়বিচার, সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৫. তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ বন্ধে সুস্পষ্ট প্রশাসনিক নীতিমালা কার্যকর রাখা।



