পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)সহ বিভিন্ন অংশীজন।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে এই প্রস্তাব উপস্থাপন করে পিডিবি।
গণশুনানিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি জানায়, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে কি না, তা মূলত সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। শুনানিতে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদসহ কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
পিডিবির দাবি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৭ টাকা ৪ পয়সায় বিক্রি হলেও এতে সরকারকে ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ৪৭ পয়সা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের দাম প্রায় ৭৭ শতাংশ বাড়ানো হলে ভর্তুকির প্রয়োজন থাকবে না।
গণশুনানিতে ভোক্তাদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে ক্যাব। সংগঠনটি বলেছে, বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জের দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো উচিত নয়। বরং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ক্যাবের বক্তব্যে আরও বলা হয়, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দ্রব্যমূল্যের ওপর পড়বে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে।
ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, “সবাই শুধু সরকারের ভর্তুকির হিসাব করছে, কিন্তু মানুষের কষ্টের কথা কেউ ভাবছে না। বিদ্যুতের দাম বাড়ালে সাধারণ মানুষ বাঁচবে কীভাবে?”
তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু বিইআরসির অবস্থানে কোনও পরিবর্তন আসেনি। মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর বদলে তারা বারবার একই ধরনের প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।”
সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স গণশুনানিকে “লোক দেখানো” আখ্যা দিয়ে বলেন, “প্রতিবারই শুনানি হয়, তারপর দাম বাড়ানো হয়। আগে বিইআরসির আইন সংশোধন করা উচিত, তারপর নতুন করে শুনানি হওয়া দরকার।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতা জালালুদ্দিন বলেন, রফতানি খাত এমনিতেই চাপে রয়েছে। এই সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে শিল্প খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত আরও ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে। ফলে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, “দাম বাড়ালেও পুরো ঘাটতি পূরণ হবে না। তবে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমে আসবে।”
সবশেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “সবার মতামত নেওয়া হয়েছে। কারিগরি মূল্যায়ন শেষে কমিশন বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে।”



