অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে আর মাত্র তিন কর্মদিবস। সরকারের শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ করেই ১ হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার এই উদ্যোগ ঘিরে শিক্ষা প্রশাসনে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াটির অস্বাভাবিক গতি এবং বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে নিম্ন মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত সাতটি স্তরের ১ হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ বিভাগের কাছে ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসের জন্য প্রয়োজন হবে আনুমানিক ১৬৭ কোটি টাকা।
‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা–২০২৫’ অনুযায়ী, গত ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন গ্রহণ করা হয়। এতে মোট ৩ হাজার ৬১৫টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৭৩৬টি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এর মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে ৪৭১টি, মাধ্যমিকে ৬২৩টি, উচ্চ মাধ্যমিক (স্কুল অ্যান্ড কলেজ) ১৩৫টি, উচ্চ মাধ্যমিক (কলেজ) ১৪৫টি, ডিগ্রি স্তরে ৭৮টি এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে ২৭৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ২৭৭টি প্রতিষ্ঠানের জন্যই ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এই স্তরকে কেন্দ্র করেই মূলত বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী অতিরিক্ত সচিব, একজন উপসচিব এবং উপদেষ্টা ও সচিবের দপ্তরের দুজন কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পুরো প্রক্রিয়াটি ‘রকেট গতিতে’ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে।
স্তরভিত্তিক বরাদ্দের হিসাবে দেখা গেছে—নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে ৪৭১টি প্রতিষ্ঠানের জন্য ১৮৩ কোটি টাকা, মাধ্যমিকে ৬২৩টির জন্য ৯২ কোটি টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক (বিদ্যালয়) ১৩৫টির জন্য ১০২ কোটি টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক (কলেজ) ১৪৫টির জন্য ১২৭ কোটি টাকা এবং ডিগ্রি স্তরে ৭৮টির জন্য ৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসের জন্য প্রয়োজনীয় ১৬৭ কোটি টাকা সংশোধিত বাজেটের মাধ্যমে সংস্থানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেষ সময়ে এমপিওভুক্তির ‘বাণিজ্য’ সহজ করতে নীতিমালায় সংশোধন আনা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থী সংখ্যা ও পাসের হারের ভিত্তিতে পয়েন্ট দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে অনেক অযোগ্য প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব কালবেলাকে বলেন, “অর্থ মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পেলেই চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। তবে এই এমপিওভুক্তি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে কি না, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্তের ওপর।”
তিনি আরও বলেন, “এমপিওভুক্তির মতো আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে নেওয়া উচিত। সরকারের বিদায়লগ্নে এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ায়।”
এ বিষয়ে জানতে শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) তাজকির-উজ-জামানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের সভাপতি সেলিম মিয়া বলেন, “দীর্ঘ আন্দোলনের ফলেই এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত এসেছে। আমরা চাই সব যোগ্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হোক। তবে যদি এই প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, সেটি অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত।”
২০২৫ সালের এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত করতে বছরে গড়ে ৩৯ লাখ টাকা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৫৩ লাখ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করতে অতিরিক্ত ৭৫ লাখ টাকা, একটি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ এমপিওভুক্ত করতে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা এবং ডিগ্রি কলেজ পর্যায়ে উন্নীত করতে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সীমিত বাজেটের মধ্যে এত বড় পরিসরে নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা সরকারের জন্য আর্থিকভাবে কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ ২০২১ সালে ২ হাজার ৭০০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। পরে নীতিমালার বাইরে রাজনৈতিক বিবেচনায় আরও ৭১টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরপর আর নতুন করে এমপিওভুক্তি হয়নি।
উল্লেখ্য, গত বছর শুধু নন-এমপিও শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির দাবিতে মোট ৮৭ দিন আন্দোলন করেছেন। এর মধ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে টানা ৩৭ দিনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।



