বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন ২৫টি বন্ধ পাটকল পুনরায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে সরকার। পুরোনো প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস, দীর্ঘদিনের লোকসান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার কারণেই এ অবস্থানে অনড় রয়েছে সরকার।
১৯৭২ সালে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কৃষকদের পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিজেএমসি। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে দেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে। অবহেলায় নষ্ট হয়েছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি, ফলে মিলগুলো পুনরায় চালু করতে প্রয়োজন হবে বিপুল বিনিয়োগ।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুব্রত শিকদার বলেন, বন্ধ পাটকলগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালুর চিন্তা সরকারের নেই। তার ভাষ্য, অধিকাংশ যন্ত্রপাতি অচল ও পুরোনো হয়ে গেছে, উৎপাদন সক্ষমতাও কমে এসেছে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময়েও এসব মিল থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য মুনাফা পায়নি।
তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর বিজেএমসির অধীনে ৭৮টি পাটকল ছিল, যা ১৯৮১ সালে বেড়ে ৮২টিতে পৌঁছায়। পরে বিরাষ্ট্রীয়করণ, পুঁজি প্রত্যাহার এবং একীভূতকরণের ফলে মিলের সংখ্যা কমতে কমতে বর্তমানে ২৫টিতে নেমে আসে। ২০২০ সালে লোকসান ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণ দেখিয়ে তৎকালীন সরকার এসব মিলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতেও সেগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সরকারি সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মিলগুলো পুনরায় চালুর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হলেও আর্থিক ঝুঁকি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং বাজার বাস্তবতা বিবেচনায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। এর পরিবর্তে লিজের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৪টি মিল লিজ দেওয়া হয়েছে এবং আরও কয়েকটির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, বিশ্ববাজারে স্বল্পমূল্যের কৃত্রিম তন্তুর ব্যাপক ব্যবহার পাটপণ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ সরকারি পাটকল পুরোনো প্রযুক্তির কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। তাই নতুন সরকারি পাটকল স্থাপনের পরিকল্পনা নেই; বরং বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
তবে সরকারের এই অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিজেএমসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের দাবি, সময়োপযোগী আধুনিকায়ন না করা, দক্ষ জনবল নিয়োগে ব্যর্থতা, উচ্চমূল্যে কাঁচাপাট ক্রয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির কারণেই শিল্পটি সংকটে পড়েছে।
এদিকে মিল বন্ধ, যন্ত্রপাতি বিক্রি এবং লিজ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও দুর্নীতির বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিজেএমসির এক কর্মকর্তা বলেন, শুধুমাত্র লোকসানের যুক্তিতে পাটকল বন্ধ করে দিলে দেশীয় পাটশিল্প আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বর্তমানে বিজেএমসিতে প্রায় ৯৪০ কর্মকর্তা ও ১,২৪৮ কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। মিলগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তর হলে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সাবেক সচিব ও বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফ বলেন, পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত ছিল সরকারের। তার দাবি, স্বাধীনতার পর থেকে অধিকাংশ মিল লাভজনক হতে পারেনি এবং পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে বর্তমান বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব ছিল না। তাই সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ছাড়া তার অন্য কোনো ভূমিকা ছিল না।



