বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি দেশের পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুলসংখ্যক শিশু আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানে ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা—এসব বিবেচনায় এই ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (IHR) ফোকাল পয়েন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ জানায়, দেশে হামের রোগী উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সংক্রমণ দেশের ভেতরেই ছড়িয়ে পড়ছে। জানুয়ারি থেকেই এই বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
রোগীর সংখ্যা ও পরিস্থিতি
১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগী ২ হাজার ৮৯৭ থেকে ২ হাজার ৯৭৩ জনের মধ্যে। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬৬ জনের, আর নিশ্চিত মৃত্যু ৩০ জন।
হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২ হাজার ৩১৮ জন, যাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯ হাজার ৭৭২ জন।
কোথায় বেশি সংক্রমণ
সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে ঢাকা বিভাগে। এছাড়া রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী পাওয়া গেছে। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতে সংক্রমণের হার বেশি।
দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ জেলায় হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে সংক্রমণ এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশু
আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু, বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সীরা। আক্রান্তদের মধ্যে বড় অংশই টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশু। অনেক শিশু টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই সংক্রমিত হচ্ছে।
হামের লক্ষণ ও সংক্রমণ
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে—
- উচ্চ জ্বর
- সর্দি ও কাশি
- চোখ লাল হওয়া
- মুখের ভেতরে সাদা দাগ
- পরে সারা শরীরে ফুসকুড়ি
সংক্রমণের ১০–১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয় এবং রোগী ফুসকুড়ি ওঠার আগে ও পরে মোট ৮ দিন পর্যন্ত অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে।
জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি
হাম থেকে গুরুতর জটিলতা হতে পারে, যেমন—
- নিউমোনিয়া
- ডায়রিয়া
- এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ)
- অন্ধত্ব
- মৃত্যু
বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু, ভিটামিন এ–এর ঘাটতিতে ভোগা শিশু এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
টিকাদানে ঘাটতি বড় কারণ
একসময় হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এমআর টিকার (হাম-রুবেলা) কভারেজ কমে যাওয়ায় ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে।
প্রতিরোধে করণীয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে—
- টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজে কমপক্ষে ৯৫% কভারেজ নিশ্চিত করা
- দ্রুত রোগ শনাক্ত ও নজরদারি জোরদার করা
- সীমান্ত এলাকায় বিশেষ সতর্কতা বাড়ানো
- হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পৃথকীকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা
- ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকাদান
টিকাদান কার্যক্রম শুরু
দেশে ইতোমধ্যে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যা ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল সক্রিয় করা হয়েছে।
সীমান্তঝুঁকি ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার–এর সঙ্গে সীমান্তবর্তী চলাচলের কারণে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলেও হামের ঝুঁকি ‘উচ্চ’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



