উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধির সমূহ সম্ভাবনা এবং দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা; এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে বন্ডবাজারে বড় ধরনের বিক্রির খবর পাওয়া যাচ্ছে । এর ফলে পরিবার ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্ডবাজারের এই পরিস্থিতি ইউরোজোন ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ওপরও চাপ তৈরি করছে।
সরকারি বন্ডের ইল্ড বৃদ্ধির ঘটনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নেই। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মত যুক্তরাজ্যের ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। জাপানেও সরকারি বন্ডের ইল্ড কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মার্কিন অর্থনীতিতে। একই সময়ে ব্যক্তিগত আয় ও ভোক্তা ব্যয়ের সূচকগুলো নির্দেশ করছে যে, মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডারেল রিজার্ভের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক তথ্য বলছে, দেশটির অর্থনীতি ও ভোক্তাদের ব্যয়ের সক্ষমতা এখনো শক্তিশালী। এর ফলে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের (ইল্ড) বেড়েছে। একই সঙ্গে মুদ্রানীতি আরও কঠোর হতে পারে-এমন আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের বিক্রি শুরু হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ঋণ নেওয়ার খরচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সব ধরনের মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড প্রায় ৯০ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। এক শতাব্দীর মধ্যে কোনো এক প্রান্তিকে এটি সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি।
এদিকে, অক্টোবরের শেষ দিকে ফেডারেল রিজার্ভ (যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক) আবারও নীতিগত সুদের হার বাড়াতে পারে-এমন প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীরা ক্রমাগত বন্ড বিক্রি করছেন। অর্থনীতিবিদগণও মার্কিন অর্থনীতিতে অতিরিক্ত উত্তাপের (ওভারহিটিং) লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরের শ্রমবাজারের প্রতিবেদন শুক্রবার (২ অক্টোবর) প্রকাশিত হওয়ার কথা। এবার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ১ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে।
বন্ডের ইল্ড বেড়ে যাওয়ায় ৩০ বছর মেয়াদি সবচেয়ে প্রচলিত গৃহঋণের (মর্টগেজ) সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুর পর এই প্রথম এটি ৭ শতাংশের ওপরে উঠেছে।
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোতে ঋণের সুদ পরিশোধে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রতিরক্ষা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে মোট বিনিয়োগকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এক্ষেত্রে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এতে তেলের দাম বাড়ছে যা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপের সঙ্গে বাড়ছে সুদের হার। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঋণসংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, জি-৭ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি ছাড়া প্রায় সব দেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১০০ শতাংশ বা তার বেশি হয়েছে।
এছাড়া, ঋণ বৃদ্ধিতে কাঠামোগত ভূমিকা রাখছে এআই খাতে দ্রুত বাড়তে থাকা বিনিয়োগ। চলতি বছর এআই খাতের পাঁচটি বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগের অর্থ জোগাড় করতে ২২০ বিলিয়ন ডলারের বন্ড ইস্যু করেছে। ঋণের চাহিদা বাড়তে থাকায় সুদের হার আরও উর্দ্ধমুখী হচ্ছে।



