-
পূজা, বড়দিন কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসবে মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানানো শরিয়তসম্মত কি না, এ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিসরে ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এ বিষয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে কিছু আলেমের মতে, অন্য ধর্মের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে সমর্থন করে এমন শুভেচ্ছা জানানো মুসলমানদের জন্য বৈধ নয়।
ঢাকার উত্তরার জামিয়া ইমাম বুখারীর মুফতি ও মুহাদ্দিস সাইদুজ্জামান কাসেমির উদ্ধৃত মতামত অনুযায়ী, ভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানানো থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা উচিত।
ইবনুল কাইয়্যেমের বক্তব্য কী?
ইসলামি পণ্ডিত ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) তাঁর ‘আহকামু আহলিয যিম্মাহ’ গ্রন্থে অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে অভিনন্দন জানানোর বিষয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত নয় এমন বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানকে সমর্থন করে অভিনন্দন জানানো নিষিদ্ধ।
তাঁর ব্যাখ্যায়, কোনো ধর্মীয় আচারকে অভিনন্দন জানানোর মাধ্যমে সেই আচারকে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ প্রকাশ পেতে পারে। এ কারণে তিনি এ ধরনের শুভেচ্ছা বিনিময়কে গুরুতর গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে এ বক্তব্যকে সব আলেমের সর্বসম্মত মত হিসেবে উপস্থাপন করার আগে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সূত্র ও ফিকহি মতামত যাচাই করা প্রয়োজন।
কোরআনে কী বলা হয়েছে?
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
আরবি:
إِنْ تَكْفُرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنْكُمْ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَإِنْ تَشْكُرُوا يَرْضَهُ لَكُمْ
অর্থ: “তোমরা কুফরি করলে আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরি পছন্দ করেন না। আর তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তিনি তা তোমাদের জন্য পছন্দ করেন।”
—সূরা আয-যুমার, আয়াত ৭।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
আরবি:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থ: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”
—সূরা আল-মায়েদা, আয়াত ৩।
আলেমদের একটি অংশ এসব আয়াতের আলোকে মনে করেন, মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্বতন্ত্র পরিচয় রক্ষা করা জরুরি। তবে ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে সাধারণ সৌজন্য ও সদাচরণের বিষয়টি ধর্মীয় আচারকে সমর্থন করার প্রশ্ন থেকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আচরণ কেমন হবে?
অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে সদাচরণ, ন্যায়বিচার ও মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো, উৎসবে অংশগ্রহণ করা কিংবা উপহার বিনিময়ের বিধান নিয়ে আলেমদের মধ্যে ব্যাখ্যাগত পার্থক্য রয়েছে।
কিছু আলেম ধর্মীয় উৎসবের শুভেচ্ছা জানানো ও উৎসবে অংশগ্রহণকে নিষিদ্ধ মনে করেন। অন্যদিকে, কিছু সমসাময়িক আলেম সামাজিক সৌজন্য প্রকাশ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে সমর্থন করার মধ্যে পার্থক্য করেন। তাঁদের মতে, শুভেচ্ছার ভাষা, উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ফিকহি ব্যাখ্যা যাচাই করা যেতে পারে।
উৎসবে অংশগ্রহণ ও উপহার বিনিময়ের বিধান
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, সেই আচার পালনের উদ্দেশ্যে বিশেষ আয়োজন করা এবং সাধারণ সামাজিক সৌজন্য প্রকাশ—এই বিষয়গুলো এক নয়। কোন কাজটি ধর্মীয় আচারকে সমর্থন করে এবং কোনটি নিছক সামাজিক সম্পর্কের অংশ, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একইভাবে, উপহার দেওয়া, খাবার বিনিময় কিংবা সহকর্মী ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌহার্দ্য বজায় রাখার বিষয়েও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আলেমদের মতামত ভিন্ন হতে পারে। তাই এসব বিষয়ে একক সিদ্ধান্তকে সব পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
উপসংহার
অন্য ধর্মের উৎসবে মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানানো জায়েজ কি না, তা নিয়ে ইসলামী আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। একদল আলেম ধর্মীয় উৎসবের শুভেচ্ছা জানানোকে নিষিদ্ধ মনে করেন; অন্যদিকে কিছু আলেম সাধারণ সৌজন্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সমর্থনের মধ্যে পার্থক্য করেন।
এ কারণে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট আলেমের মতামতকে তাঁর নিজস্ব ফিকহি অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করা এবং কোরআন-হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় সূত্রের আলোকে বিষয়টি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত, মানবিক ও সম্মানজনক আচরণ বজায় রাখাও জরুরি।
পূজা বা অন্য ধর্মীয় উৎসবে মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানানো কি জায়েজ?



