পাউরুটি উৎপাদনে ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছে মুভমেন্ট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড গুড গভর্নেন্স ফাউন্ডেশন (এমএইচআরজিএফ)। একই সঙ্গে পাউরুটি বাজারজাত করার সময় প্যাকেটের গায়ে ‘পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার করা হয়নি’—এমন ঘোষণা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
জনস্বার্থে রোববার (২৬ জুলাই) এমএইচআরজিএফের পক্ষে সংগঠনটির চেয়ারম্যান কবীর আলমগীর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট আবেদন করেন।
রিটে খাদ্য সচিব, বাংলাদেশ অটো বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ম্যানুফেকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে।
আবেদনে পাউরুটি উৎপাদন ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা, প্যাকেটজাত খাদ্যে ব্যবহৃত উপকরণের তালিকা বাধ্যতামূলক করা এবং ক্ষতিকর এই রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
রিট দায়েরের বিষয়ে এমএইচআরজিএফের চেয়ারম্যান কবীর আলমগীর বলেন, সম্প্রতি ‘পাউরুটিতে মিলছে ক্যানসারের উপাদান’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে এ আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি পটাশিয়াম ব্রোমেটের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্যও রিট আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে পটাশিয়াম ব্রোমেট নিষিদ্ধ। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ২০১৬ সাল থেকে এর ব্যবহার বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালে খাদ্যপণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেও এর ব্যবহার বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কবীর আলমগীর বলেন, ‘অনিরাপদ খাদ্যের কারণে মানুষ যেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে না পড়ে, সে জন্য রাষ্ট্রকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দাবিতেই এই রিট করা হয়েছে।’
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্যের কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ক্যানসারে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং নতুন রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। এ ছাড়া কিডনি জটিলতাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্তের হারও উদ্বেগজনক।
আবেদনে আরও বলা হয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনেক বেকারি প্রতিষ্ঠান যথাযথ নিয়ম না মেনে পাউরুটি উৎপাদন করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
রিটকারীর আইনজীবী সঞ্জয় মণ্ডল বলেন, ক্যানসারের চিকিৎসায় অনেক পরিবার সর্বস্ব হারাচ্ছে। খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক যেন মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে এই রিট করা হয়েছে।
তিনি জানান, চলতি সপ্তাহের যেকোনো দিন বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটটির শুনানি হতে পারে।
এর আগে ২০২১ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কয়েকটি পাউরুটিতে অতিরিক্ত মাত্রায় পটাশিয়াম ব্রোমেটের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ওই বছর ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ১৯টি পাউরুটির নমুনার মধ্যে ১৬টিতেই মাত্রাতিরিক্ত পটাশিয়াম ব্রোমেট শনাক্ত হয়।
পরীক্ষায় এসব পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেটের মাত্রা ৩ দশমিক ৩১ থেকে ১২ দশমিক ৯১ পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া যায়। পরে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ রুটি, পাউরুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট (KBrO₃) এবং পটাশিয়াম আয়োডেট (KIO₃) ব্যবহার নিষিদ্ধ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পটাশিয়াম ব্রোমেট মানবদেহে থাইরয়েড সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এটি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে সক্ষম এবং জেনোটক্সিক কারসিনোজেন হিসেবে জিনগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এ ছাড়া ডায়রিয়া, বমিভাব ও পেটের বিভিন্ন সমস্যার কারণও হতে পারে। তাই বেকারি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।



