সরকারিভাবে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্ত সিন্ডিকেট। কমবেশি ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি হয় ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। জ্বালানি পরিবহনের প্রিমিয়াম নিয়ে ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি) শক্ত খুঁটি গেঁড়েছে সিন্ডিকেটটি।
এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন এজাজুর রহমান নামে এক চিকিৎসক। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করার পাশাপাশি দাপ্তরিক কার্যক্রম, লোকবল ও সরবরাহ চেইনসহ সামগ্রিকভাবে ওই সিন্ডিকেটটি জ্বালানি খাতে নিজেদের দাঁড় করিয়েছে ‘আরেক বিপিসি’ হিসেবে। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে উঠে আসা এ সিন্ডিকেট কারসাজির আদ্যোপান্ত নিয়ে নিজস্ব প্রতিবেদক ইকবাল হোসেনের তিন পর্বের ধারাবাহিকের আজ থাকছে প্রথম পর্ব।দেশে তরল জ্বালানি তেল আমদানি, পরিশোধন, বিপণন করে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বাংলাদেশে ৭২ লাখ টন তরল পেট্রোলিয়াম জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধন করা হয়। অবশিষ্ট পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করা হয়, যার ৮০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ এক ব্যক্তির হাতে।
পরিশোধিত জ্বালানির মধ্যে ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল, মেরিন ফুয়েল নিজেরাই আমদানি করে বিপিসি। উন্মুক্ত দরপত্র ও জিটুজি পদ্ধতিতে এসব জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপিসির ১১টি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টির লোকাল এজেন্ট ডা. এজাজুর রহমান নামে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন দুই প্রতিষ্ঠান।বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ ওই দুই প্রতিষ্ঠানের হাতে। যদিও জাগো নিউজের পক্ষ থেকে জানতে চাইলে সিন্ডিকেট কারসাজির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন ডা. এজাজুর রহমান। কিন্তু কাগজ-কলমের পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা।
বিপিসির তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ১১
বিপিসির সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদেশি ১১টি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি তেল সরবরাহকারী হিসেবে বিপিসির তালিকাভুক্ত। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইউনিপেক (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড, পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি)-জাপিন ইন্দোনেশিয়া, পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড (পিটিএলসিএল) মালয়েশিয়া, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং পিটিই লিমিটেড থাইল্যান্ড, ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড (ওকিউটি) ওমান, পেট্রোচায়না ইন্টারন্যাশনাল (সিঙ্গাপুর) প্রাইভেট লিমিটেড চায়না, অ্যামিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (ইনোক) সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল) ভারত, নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) ভারত, ভিটল এশিয়া পিটিই লিমিটেড সিঙ্গাপুর এবং সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েল (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানগুলো জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে বিপিসিকে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ দেয়।এর মধ্যে ইউনিপেক (সিঙ্গাপুর) এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিন দুই সরবরাহকারীর স্থানীয় এজেন্ট সেভেন মার্ক। মালয়েশিয়ান পিটিএলসিএল, থাইল্যান্ডের পিটিটিটি, সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া এবং সায়নোকেম প্রতিষ্ঠান চারটির স্থানীয় এজেন্ট ট্রান্সবাংলা কমোডিটিস লিমিটেড। সিঙ্গাপুরের পেট্রোচায়নার স্থানীয় এজেন্ট মেরিনার্স ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম কোং লিমিটেড, আমিরাতের ইনোকের স্থানীয় এজেন্ট ইশান ট্রেডার্স।এছাড়া ওমানের ওকিউটি, ভারতের আইওসিএল এবং এনআরএল প্রতিষ্ঠান তিনটি নিজেদের কান্ট্রি হেড দিয়ে বিপিসির সঙ্গে লিয়াজোঁ করেন। এর মধ্যে সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী ডা. এজাজুর রহমান।
যে পদ্ধতিতে সরবরাহ হয় জ্বালানি
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির মধ্যে ৫০ শতাংশ জি-টু-জি এবং ৫০ শতাংশ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি-জুন দুই মেয়াদে পরিশোধিত জ্বালানি সংগ্রহ করে বিপিসি।
ডা. এজাজুরের একক আধিপত্য
পেশায় চিকিৎসক ডা. এজাজুর রহমান বেড়ে ওঠেন চট্টগ্রামে। তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাইস্কুলে পড়ালেখা করেন। এমবিবিএস পাস করেন সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ থেকে। প্রথমে বায়িং হাউজের ব্যবসা শুরু করলেও পরবর্তীসময়ে তিনি শিপিং ব্যবসায় জড়িত হন। ২০০৯ সালের দিকে তিনি বিপিসিতে জ্বালানি সরবরাহে যুক্ত হন। এখন তিনি এ খাতের নিয়ন্ত্রক।২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জুন মেয়াদে জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বমোট ২৭ লাখ ১০ হাজার টনের মধ্যে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহের কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় এজেন্টের মালিক ডা. এজাজুর রহমান। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জি-টু-জি এবং উন্মুক্ত দরপত্রে কার্যাদেশ দেওয়া ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পেট্রোলিয়াম জ্বালানির মধ্যে ৪৩ লাখ টনের কার্যাদেশ পায় ডা. এজাজুর রহমানের ছয় প্রতিষ্ঠান, যা বার্ষিক মোট আমদানির ৭৮ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চার প্যাকেজে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ‘এ’ প্যাকেজে ৪ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল ও ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় পেট্রোচায়না সিঙ্গাপুর, ‘বি’ প্যাকেজে ৪ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল, ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ‘সি’ প্যাকেজে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েলের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া এবং ‘ডি’ প্যাকেজে ৫০ হাজার টন অকটেন সরবরাহের কার্যাদেশ পায় সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল।
চলতি (২০২৫-২০২৬) অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে জি-টু-জি পদ্ধতিতে ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয় সাত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল, ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েল, ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল, ৭৫ হাজার টন অকটেন, ১৫ হাজার টন মেরিন ফুয়েলের বরাদ্দ পায় বিএসপি-জাপিন।



