দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ২০০৩ সালে দেশটিতে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর দীর্ঘ ২৩ বছরের সামরিক উপস্থিতির অবসান হলো। মার্কিন সেনাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইরাকে নতুন দিনের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে দেশটির সরকার। তবে এ প্রত্যাহারের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার ইরাকে অবস্থানরত শেষ মার্কিন সেনারা দেশটি ছেড়ে যান। দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির অবসান উপলক্ষে ইরাকজুড়ে দেখা গেছে উৎসবের আমেজ। এ উপলক্ষে সরকার চার দিনের সরকারি ছুটিও ঘোষণা করেছে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ইরাকিদের মধ্যে যেমন আনন্দ রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী সরে যাওয়ায় প্রতিবেশী ইরানের জন্য দেশটিতে প্রভাব বিস্তারের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ, ইরাকে ইরানপন্থি বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। মার্কিন বাহিনীর অনুপস্থিতিতে এসব গোষ্ঠী আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল বুধবার। তবে তার এক দিন আগেই প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে বলে আলজাজিরাকে জানিয়েছেন ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র। তিনি বলেন, ইরাকে এখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কোনো সেনা নেই। তাদের অনুপস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় সক্ষম ইরাকি বাহিনী।
২০২৪ সালে প্রত্যাহারের সমঝোতা
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের বিষয়ে ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছিল। ওই সময় ইরাকে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন।
পরবর্তী সময়ে তাদের বেশির ভাগকেই ইরাক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শুধু আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলগুলোতে কিছু মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। তবে তাদের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করেনি মার্কিন বাহিনী।
২০০৩ সালে শুরু, একসময় সেনা ছাড়িয়েছিল ১ লাখ ৭০ হাজার
২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অভিযানে তৎকালীন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা একপর্যায়ে ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২০১১ সালে মার্কিন সেনাদের একটি বড় অংশ ইরাক ছেড়ে যায়। তবে ২০১৪ সালে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য আবারও ইরাকে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়।
‘নতুন যুগের সূচনা’
মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ায় ইরাকের জন্য নতুন একটি যুগের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি।
তিনি বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে ইরাক একটি নতুন দিনের দিকে এগিয়ে গেল। দেশটি বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থেকে মুক্ত হবে এবং একই সঙ্গে পুরো ভূখণ্ডের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
মার্কিন সেনাদের বিদায়কে ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরি।
ইয়াসিরি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি ‘কালো অধ্যায়ের’ অবসান ঘটবে। তাঁর ভাষায়, ইরাকের মানুষ দেশটিতে দখলদারদের ব্যর্থতার অবসান উদ্যাপন করবে।
তবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানালেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ফালুজা অঞ্চলের একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে দেশের নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য ইরাক প্রস্তুত নয়। তাঁর মতে, ইরাকের জনগণ পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চাইলেও মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার ফলে যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
ইরাকে ইরানের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা
ইরাকে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের মতো তেহরান-সমর্থিত বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলার ক্ষেত্রেও এসব গোষ্ঠীর ভূমিকার কথা উঠে এসেছে।
চলতি মাসেই ইরাক থেকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ইরান যুদ্ধের সময় নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে ছিলেন বলে জানা গেছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের ইরাক ছাড়ার ঘটনায় কৌশলগতভাবে ইরান লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, এর ফলে ইরাক থেকে এমন একটি সামরিক উপস্থিতি সরে গেল, যা বহু বছর ধরে দেশটিতে তেহরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করে রেখেছিল।
ফলে মার্কিন সেনাদের বিদায়ের পর ইরাকের নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য এবং দেশটিতে ইরানের প্রভাব—এই তিনটি বিষয়ই এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সূত্র: আলজাজিরা



