তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসন্ন নির্বাচনের জন্য ইশতেহার প্রস্তুত করছে বিএনপি। দল ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বয়ে ইতোমধ্যে ইশতেহারের খসড়া সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। শিগগিরই একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হবে। এরপর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন শেষে ইশতেহার চূড়ান্ত করা হবে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ এবং খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানী ইশতেহারে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাক্স্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। জুলাই সনদের আলোকে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের কর্মপরিকল্পনাও ইশতেহারে যুক্ত করা হবে।
ইশতেহার তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক নেতা বলেন, দেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের যে নীতিগত কর্মসূচি বিএনপি গ্রহণ করেছে, তার ভিত্তিই হচ্ছে এই ইশতেহার। এবারের ইশতেহারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ফ্যামিলি কার্ড ও পরিবেশ—বিশেষ করে তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাই মূল প্রাধান্য পাবে। পাশাপাশি সুশাসন, রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার ও জবাবদিহিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ ইশতেহারের অন্যতম প্রধান অঙ্গ হবে।
ইশতেহার ঘোষণার বিষয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করেছে, এখন দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির জানান, ইশতেহারে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। অর্থনীতিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। যুবকদের কর্মসংস্থান ইশতেহারের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা অথবা চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খাদ্য সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষকদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে সার-বীজ, সরকারি ভর্তুকি, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্র, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা, ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি, প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মৎস্যচাষী ও প্রাণিসম্পদ খামারিরাও এই সুবিধার আওতায় আসবেন।
স্বাস্থ্য খাতে প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে দুর্নীতি প্রতিরোধ, সারা দেশে প্রায় এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ (যাদের ৮০ শতাংশ নারী) এবং পর্যায়ক্রমে মহানগর ও জেলা শহরে নাগরিকদের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা খাতে আধুনিক ও আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, মাধ্যমিক পর্যায় থেকে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু, কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ‘মিড-ডে মিল’ চালু, ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, ৬৪ জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিকেএসপি শাখা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন-পুনঃখনন, তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার অঙ্গীকার থাকবে ইশতেহারে।
খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানী, ধর্মীয় উৎসবে বিশেষ ভাতা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথাও ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে। একই সুবিধা অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়ের প্রধানদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপি’র ইশতেহার দেশের মৌলিক গণতান্ত্রিক সংস্কার, গণমানুষের কল্যাণ ও অর্থনৈতিক মুক্তিকে সামনে রেখে প্রণীত হচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পরই এই ইশতেহার প্রকাশ করা হবে।



