وَعَلَيْــــــــــــــــــــكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
তাবিজ, আমিল বা কোনো অপারগ শক্তির সহায়তা নিয়ে কাউকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করা, বশে আনা কিংবা তার ক্ষতি করার চেষ্টা ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েজ ও গুরুতর গুনাহের কাজ। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে জাদু বা সেহরের পর্যায়ে পড়ে।
কাউকে তার স্বাভাবিক ইচ্ছা ও অনুভূতির বিরুদ্ধে প্রভাবিত করার চেষ্টা যেমন অনৈতিক, তেমনি এর মাধ্যমে ঈমান ও আকিদারও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যদি শিরক, কুফরি বক্তব্য, মন্ত্র বা অজ্ঞাত কোনো শক্তির সাহায্য নেওয়ার বিষয় যুক্ত থাকে, তাহলে তা আরও গুরুতর রূপ নিতে পারে।
এ কারণে এ ধরনের কাজে জড়িত ব্যক্তির উচিত তা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তাবিজ-আমল, জাদু বা কাউকে জোরপূর্বক বশ করার মতো কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর সংকল্প করা প্রয়োজন।
কোনো বৈধ ও শরিয়তসম্মত উদ্দেশ্য পূরণ করতে হলে কাউকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করার অবৈধ পথ অনুসরণ না করে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করা উচিত। হালাল, কল্যাণকর ও বরকতময় পথের জন্য তাঁর কাছেই প্রার্থনা করা ইসলামের নির্দেশিত পন্থা।
জোরপূর্বক কিংবা তাবিজ-আমলের মাধ্যমে তৈরি কোনো সম্পর্কের মধ্যে প্রকৃত সুখ ও বরকত থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে থেকে বৈধ উপায়ে সম্পর্ক ও জীবনের কল্যাণ কামনাই একজন মুসলমানের জন্য নিরাপদ ও শরিয়তসম্মত পথ।
শরঈ দলিল
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে বলেন—
وَاتَّبَعُوۡا مَا تَتۡلُوا الشَّیٰطِیۡنُ عَلٰی مُلۡکِ سُلَیۡمٰنَ ۚ وَمَا کَفَرَ سُلَیۡمٰنُ وَلٰکِنَّ الشَّیٰطِیۡنَ کَفَرُوۡا یُعَلِّمُوۡنَ النَّاسَ السِّحۡرَ ٭ وَمَاۤ اُنۡزِلَ عَلَی الۡمَلَکَیۡنِ بِبَابِلَ ہَارُوۡتَ وَمَارُوۡتَ ؕ وَمَا یُعَلِّمٰنِ مِنۡ اَحَدٍ حَتّٰی یَقُوۡلَاۤ اِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَۃٌ فَلَا تَکۡفُرۡؕ فَیَتَعَلَّمُوۡنَ مِنۡہُمَا مَا یُفَرِّقُوۡنَ بِہٖ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ وَزَوۡجِہٖؕ وَمَا ہُمۡ بِضَآرِّیۡنَ بِہٖ مِنۡ اَحَدٍ اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِۚ وَیَتَعَلَّمُوۡنَ مَا یَضُرُّہُمۡ وَلَا یَنۡفَعُہُمۡؕ وَلَقَدۡ عَلِمُوۡا لَمَنِ اشۡتَرٰىہُ مَا لَہٗ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنۡ خَلَاقٍ۟ؕ وَلَبِئۡسَ مَا شَرَوۡا بِہٖۤ اَنۡفُسَہُمۡؕ لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ ١۰٢
বাংলা অর্থ: তারা সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর রাজত্বের সময় শয়তানরা যে জাদুর কথা প্রচার করত, তার অনুসরণ করেছিল। অথচ সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই মানুষকে জাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছিল। বাবিল শহরে হারূত ও মারূত নামের দুই ফেরেশতার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তারও অনুসরণ করা হয়েছিল। তারা কাউকে কিছু শেখানোর আগে সতর্ক করে বলত, ‘আমরা তো পরীক্ষাস্বরূপ, সুতরাং কুফরিতে লিপ্ত হয়ো না।’ এরপরও তারা এমন জিনিস শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো হতো। তবে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা কারও কোনো ক্ষতি করতে পারত না। তারা এমন কিছু শিখত, যা তাদের জন্য ক্ষতিকর, উপকারী নয়। তারা ভালোভাবেই জানত, যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করবে, আখিরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না। তারা যে বিনিময়ে নিজেদের বিক্রি করেছে, তা কতই না মন্দ—যদি তারা তা জানত!
তাফসিরে তাওযীহুল কুরআনের ব্যাখ্যা
তাফসিরে তাওযীহুল কুরআনে বলা হয়েছে, এসব আয়াতে ইয়াহুদিদের একটি গুরুতর অপরাধের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তারা এমন জাদু-টোনার পেছনে ছুটেছিল, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষ করে কোনো জাদুর মন্ত্র বা পদ্ধতির মধ্যে শিরকী বক্তব্য থাকলে তা কুফরির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
তাফসিরে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর সময়ে কিছু শয়তান—যাদের মধ্যে জিন ও মানুষ উভয়ই থাকতে পারে—কিছু ইয়াহুদিকে জাদুর প্রতি প্ররোচিত করেছিল। তারা প্রচার করেছিল, সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর রাজত্বের রহস্য জাদুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং জাদু শিখলে তারাও অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। এর ফলে তারা জাদু শেখা ও তা প্রয়োগে জড়িয়ে পড়ে।
অথচ জাদু শিক্ষা শুধু শরিয়তবিরোধীই ছিল না, এর কিছু পদ্ধতি কুফরির পর্যায়েও পৌঁছে যেত। তাফসিরে ইয়াহুদিদের আরেকটি গুরুতর অপরাধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়িয়েছিল এবং তাঁকে জাদুকর হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছিল। এমনকি তাঁর জীবনের শেষদিকে তিনি মূর্তিপূজা শুরু করেছিলেন—এমন দাবিও প্রচার করা হয়েছিল। তাফসিরে এসবকে অপবাদমূলক বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোরআন মাজিদের এই আয়াতে সেই অপবাদ সরাসরি খণ্ডন করা হয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) কুফরি করেননি। বরং শয়তানরাই মানুষকে জাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরির দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
তাফসিরে আরও বলা হয়েছে, এ বক্তব্য কোরআন মাজিদের স্বাতন্ত্র্যও তুলে ধরে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে ইয়াহুদিদের ধর্মগ্রন্থের এসব বিষয় জানার কোনো পার্থিব মাধ্যম ছিল না; তিনি ওহির মাধ্যমে এসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেছেন। ফলে হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর বিরুদ্ধে প্রচারিত অপবাদ শুধু উল্লেখই করা হয়নি, বরং তা দৃঢ়ভাবে খণ্ডনও করা হয়েছে।
সুতরাং কাউকে নিজের ইচ্ছামতো বশে আনা, তার স্বাভাবিক অনুভূতি পরিবর্তনের চেষ্টা করা কিংবা তাবিজ, জাদু ও অনৈতিক আমলের মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করার পথ ইসলামের নির্দেশিত পথ নয়। কোনো সম্পর্ক বা প্রয়োজন পূরণে একজন মুসলমানের উচিত আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করা এবং বৈধ ও শরিয়তসম্মত উপায়ে কল্যাণ কামনা করা।



