tanaka

জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে উন্নত দেশগুলোকে আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য তহবিল পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন...
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকতাপপ্রবাহে বাড়ছে এসির চাহিদা, বিশ্ববাজারে চীনের আধিপত্য

তাপপ্রবাহে বাড়ছে এসির চাহিদা, বিশ্ববাজারে চীনের আধিপত্য

বিশ্বজুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রা ও ভয়াবহ তাপপ্রবাহের কারণে এয়ার কন্ডিশনার বা এসির চাহিদা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তীব্র গরম ও দাবানলের মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কিনতে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এতে ইউরোপের বাজারে চীনা এসি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ইউরোপে এসির ব্যবহার কম ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরম থেকে স্বস্তি পেতে অনেক ইউরোপীয় এখন এসি কিনতে দোকানে ভিড় করছেন। কেউ কেউ দূর-দূরান্তে গিয়েও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।

চীনের বড় এসি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, বিদেশের বাজারে তাদের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে একই সময়ে ফ্রান্স, জার্মানি ও বেলজিয়ামসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশের নেতারা চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, চীনা পণ্যের আমদানি স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অন্যদিকে চীনের দাবি, ইউরোপীয় ভোক্তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে চীনা কোম্পানিগুলোর ভূমিকা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া এক নিবন্ধে ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের সমালোচনা করে বলেছে, চীনা এসির ওপর শুল্ক আরোপ করলে ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

বাণিজ্য সংকটের মধ্যেও বাড়ছে চীনা পণ্যের চাহিদা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি গত বছর প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ইউরো বা ৪০৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের রপ্তানি বাড়ায় এই ব্যবধান আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়িসহ বিভিন্ন পণ্যে চীনের অগ্রগতি ইউরোপের শিল্পখাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সাংহাইভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টাইডালওয়েব সল্যুশনের জ্যেষ্ঠ অংশীদার ক্যামেরন জনসনের মতে, এই পরিস্থিতি চীন ও ইউরোপের মধ্যে চলমান বাণিজ্য আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে চীনা এসির আধিপত্য

শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও এয়ার কন্ডিশনারের বাজারে চীনের প্রভাব বাড়ছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এসি বাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ চীনা ব্র্যান্ডের দখলে। বিশ্বব্যাপী এই হার গত বছর প্রায় ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

ইউরোমনিটরের ভোক্তা পণ্য বিভাগের বৈশ্বিক অন্তর্দৃষ্টি ব্যবস্থাপক ভেরোনিকা কানদুসোভা বলেন, বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর বাজার অংশ আরও বাড়তে পারে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত নতুন পণ্য তৈরি করতে পারায় চীনা কোম্পানিগুলো বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে ইউরোপের অভ্যাস

উচ্চ বিদ্যুৎ খরচ, স্থাপনের ব্যয় এবং পুরোনো ভবনে এসি বসানোর নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ইউরোপে এতদিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অনেক পরিবার মনে করত, গ্রীষ্মের স্বল্পমেয়াদি গরমের জন্য এসি স্থাপন করা খুব একটা প্রয়োজনীয় নয়।

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ও তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ায় সেই ধারণা বদলে যাচ্ছে।

চীনের অন্যতম বড় গৃহস্থালি পণ্য নির্মাতা মেইডা ইউরোপের বাজারের জন্য তৈরি করেছে বিশেষ পোর্টাস্প্লিট এসি। এটি বহনযোগ্য, কম শব্দ করে এবং ইউরোপীয় জানালার নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোম্পানির দাবি, চলতি বছরে এই মডেলের বিক্রি দুই লাখ ইউনিট ছাড়িয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।

ইউরোপকে বড় বাজার হিসেবে দেখছে চীন

চীনের জন্য ইউরোপ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় বাজার। দেশটির অভ্যন্তরীণ আবাসন সংকট ও কমে যাওয়া ভোগব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে। এ অবস্থায় রপ্তানি বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করছে চীন।

গত বছর দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রেকর্ড ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সৌর প্রযুক্তির মতো উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য থেকে। এসব খাতকে চীনের নতুন তিন রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিপরীতে পোশাক, আসবাব ও গৃহস্থালি পণ্যের মতো প্রচলিত রপ্তানি খাতের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কমেছে।

এখন ইউরোপের ক্রমবর্ধমান গরম আবহাওয়া চীনের গৃহস্থালি পণ্য নির্মাতাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রোল্যান্ড বার্জারের বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেনিস দেপুর মতে, ইউরোপে এসি ব্যবহারের হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম—প্রায় ২০ শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ।

তার ভাষায়, ইউরোপ চীনা এসি নির্মাতাদের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় বাজার। এখানে এসির চাহিদা বাড়ছে, বাজার এখনো অনেকটাই নতুন এবং ভবিষ্যতে লাভের সুযোগও রয়েছে।

তাপ কমলে কি থাকবে এই চাহিদা?

চীনের শানডংসহ কয়েকটি প্রদেশে শীতলীকরণ পণ্য উৎপাদনে সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলেও দেশটির গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসির চাহিদা অনেকটাই মৌসুমি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে এই বাজার কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ডেনিস দেপু বলেন, গ্রীষ্মের তীব্র গরম কেটে গেলে মানুষ হয়তো এসির প্রয়োজনীয়তার কথা কিছুটা ভুলে যেতে পারে। তবে পরবর্তী গ্রীষ্মে আবারও চাহিদা বাড়বে।

এদিকে চীনের এক সরবরাহকারী ইতোমধ্যে ইউরোপের ব্যবসায়ীদের আগামী বছরের জন্য এসির মজুত বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। উইচ্যাটে প্রকাশিত একটি প্রচারণামূলক ভিডিওতে তিনি ইউরোপের বর্তমান এসি বাজারকে ‘গোল্ড রাশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তার পরামর্শ, ২০২৭ সালের সম্ভাব্য চাহিদার উল্লম্ফন শুরু হওয়ার আগেই ব্যবসায়ীদের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে।

সূত্র: সিএনএন