প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তিনি নতুন সরকারে কোনো পদে থাকবেন না—নির্বাচিত বা নিযুক্ত, কোনো ভূমিকাতেই না।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেসারেট নিউজ-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি এ কথা জানান। সেখানে তিনি লেখেন: “আমি শুরু থেকেই পরিষ্কার করেছি—নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হবে। আমাদের সরকারের একমাত্র লক্ষ্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করা। এরপর আমি কোনো সরকারি দায়িত্বে থাকব না।”
নিবন্ধে তিনি আরও বলেন—
গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি:
দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই যাত্রা বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। দ্য ইকোনমিস্ট ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করে। দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠন, নির্বাচন আয়োজন ও পাচার হওয়া বিলিয়ন ডলার ফেরত আনার কাজে সরকার ব্যস্ত সময় পার করেছে।
মানবিক দায় ও ন্যায়বিচার:
স্বৈরশাসনের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো ছিল অগ্রাধিকার। নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং শোককে ভাগ করে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে, পূর্বতন সরকার প্রতিবছর ১০-১৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে—এটা শুধু অর্থ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাও লুটপাট হয়েছে।
চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অগ্রগতি:
দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল ভেঙে পড়া, পুলিশ ছিল অনুপস্থিত, অর্থনীতি বিপর্যস্ত, মানুষ নির্যাতনের শিকার, প্রশাসন ছিল দলীয় আনুগত্যের বলি। তারপরও ধীরে ধীরে দেশ পুনর্গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিসর ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা:
নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা এসেছে। ৫ আগস্ট সেনাবাহিনী বিক্ষোভ দমন না করে যে ধৈর্য ও পেশাদারিত্ব দেখিয়েছে, তা এক ইতিহাস হয়ে থাকবে। তারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
স্বচ্ছ নির্বাচনই একমাত্র লক্ষ্য:
“নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশের প্রতিটি নাগরিক, এমনকি প্রবাসীরাও যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে—সেটিই আমাদের উদ্দেশ্য।”
পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক সম্পর্ক:
সরকার ইতিবাচক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে। প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা পেয়েছে বাংলাদেশ।
ভবিষ্যতের জন্য সংস্কার পরিকল্পনা:
বৃহৎ সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো সংবিধান সংশোধন—যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ফিরে না আসে।
তরুণদের ভূমিকা ও ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি:
তরুণ প্রজন্ম, দেশে ও প্রবাসে, এই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। তাদের সৃজনশীলতা, সাহস ও নেতৃত্ব আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, অর্থবহ পরিবর্তন সম্ভব। ড. ইউনূস বিশ্বাস করেন, “জেনারেশন জেড, মিলেনিয়ালস, এক্স এবং আলফা একসঙ্গে এমন একটি বিশ্ব গড়তে পারবে, যেখানে থাকবে—
শূন্য বেকারত্ব, শূন্য দারিদ্র্য, এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ।“
বাংলাদেশ যদি এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয় যেখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও আশার আলোয় বাঁচতে পারে—তবে তার পেছনে থাকবে জনগণের অদম্য সংকল্প, কল্পনা এবং সাহস।



