আর্কটিকের নর্দার্ন সি রুটে নিয়মিত বাণিজ্যিক জাহাজ চালানোর পরিকল্পনা চীনা প্রতিষ্ঠানের
এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে আর্কটিক অঞ্চলের নর্দার্ন সি রুট (এনএসআর) ব্যবহার করে নিয়মিত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঘোষণা দিয়েছে চীনের শিপিং কোম্পানি ‘সি লেজেন্ড’। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রচলিত নৌপথের তুলনায় এই রুট ব্যবহার করে এশিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে সময় প্রায় ৪০-৫০ দিন থেকে কমিয়ে ২০ দিনের কাছাকাছি আনা সম্ভব।
প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই নৌপথ রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে আর্কটিক মহাসাগরের মধ্য দিয়ে গেছে। নতুন রুটে চীনের পূর্বাঞ্চলের আন্তর্জাতিক বন্দর নিংবোর সঙ্গে যুক্ত হবে যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম কনটেইনার বন্দর ফেলিক্সস্টো। যাত্রাপথটি পূর্ব এশিয়া ও উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে দ্রুততম সামুদ্রিক সংযোগগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ৩৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি কনটেইনার জাহাজ গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নিংবো বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছে। জাহাজটিতে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কনটেইনার এবং ২০ জন ক্রু সদস্য। আর্কটিক মহাসাগরের ভাসমান বরফ অতিক্রম করে জাহাজটির যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
গ্রীষ্মকালে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ কিছুটা গলে যাওয়ায় সীমিত সময়ের জন্য নৌযান চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘সি লেজেন্ড’ আগামী দুই মাসে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি করে জাহাজ এই রুটে পরিচালনার পরিকল্পনা করছে।
কেন নর্দার্ন সি রুট?
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাত, বাণিজ্যিক শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রচলিত নৌপথে নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে বিকল্প বাণিজ্যপথের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে অনেক বড় বাণিজ্যিক জাহাজ সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপে যাচ্ছে। এতে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ৫০ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। ফলে পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের সময় উভয়ই বেড়েছে।
রুটটির নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে
নর্দার্ন সি রুট বছরের বেশিরভাগ সময় ভারী বরফে আবৃত থাকে। গ্রীষ্মের স্বল্প সময়ের মধ্যে জাহাজ চলাচল সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘রোসাটম’-এর অধীন আইসব্রেকার জাহাজের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন এই নৌপথ ইউক্রেন যুদ্ধের পর আরও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ইউরোপের অনেক কোম্পানি এই রুট ব্যবহারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে চীনের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার শিপিং কোম্পানি ‘প্যানস্টার’ চলতি মাসের শেষদিকে এই পথে পরীক্ষামূলক যাত্রা পরিচালনা করতে পারে বলে জানা গেছে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি বাড়ছে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
নর্দার্ন সি রুটে চীনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আর্কটিক অঞ্চলে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতির বিষয়টিও সামনে এনেছে। চীন প্রায় এক দশক আগে থেকেই আর্কটিক অঞ্চলে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। দেশটির বৃহৎ বাণিজ্যিক উদ্যোগ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর সঙ্গেও এই রুটের সংযোগ রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা জোরদার হওয়ায় আর্কটিক অঞ্চলে চীন রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
লজিস্টিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘জেনেটা’র বিশেষজ্ঞ পিটার স্যান্ড সিএনএনকে বলেন, বিষয়টি শুধু বাণিজ্যিক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে নিরাপত্তা ও আর্কটিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ও জড়িত। ফলে রাশিয়ার নিরাপত্তা স্বার্থের পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক ও কৌশলগত উপস্থিতিও পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।



