দেশের অন্যতম প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও লেখক বদরুদ্দীন উমর আর নেই। রোববার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা ৫ মিনিটে তিনি রাজধানীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানান, “আজ সকালে অসুস্থ অবস্থায় তাকে বাসা থেকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।”
বদরুদ্দীন উমরের বর্ণাঢ্য জীবন শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা দিয়ে। পরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং উচ্চশিক্ষা ও সমাজ বিশ্লেষণের এক নতুন ধারা সূচনা করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী।
এক সময় পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০০৩ সালে ‘জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল’ গঠন করে সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব নেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বদরুদ্দীন উমরের অবস্থান ছিল স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী। ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বিষয়ে তার লেখা বইগুলো—বিশেষ করে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৬), ‘সংস্কৃতির সংকট’ (১৯৬৭) এবং ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৯)—তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ভারতের বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন বদরুদ্দীন উমর। তার পিতা আবুল হাশিম ছিলেন উপমহাদেশের খ্যাতনামা মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতা এবং মুসলিম লীগের সক্রিয় সদস্য। পারিবারিক পরিবেশেই তিনি রাজনীতি ও সমাজ ভাবনার বীজ লাভ করেন, যা তার লেখালেখি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
২০২৫ সালে বদরুদ্দীন উমরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়, যদিও তিনি সেই পুরস্কার গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
গত ২২ জুলাই শ্বাসকষ্ট ও রক্তচাপজনিত সমস্যায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসা শেষে কিছুদিন পর বাসায় ফেরেন। বয়সের ভার ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি আজীবন যুক্ত ছিলেন লেখালেখি, বিশ্লেষণ এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে।
বদরুদ্দীন উমর ছিলেন শুধু লেখক নন, ছিলেন মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক অক্লান্ত প্রবক্তা—বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলের এক অবিচ্ছেদ্য নাম।



