tanaka
প্রচ্ছদরাজনীতিগুম প্রতিরোধে ১৪ দফা দাবিতে স্পিকারের কাছে ১১ দলীয় জোটের স্মারকলিপি

গুম প্রতিরোধে ১৪ দফা দাবিতে স্পিকারের কাছে ১১ দলীয় জোটের স্মারকলিপি

গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন, বিচার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আইন প্রণয়নসহ ১৪ দফা দাবি জানিয়েছে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন জাতীয় কমিটি’। এসব দাবি বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এ সময় ১১ দলীয় ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।

রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে পদযাত্রা ও অবস্থান কর্মসূচি শেষে এ স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এর আগে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর বাংলামোটর মোড় থেকে পদযাত্রা শুরু হয়। পরে পদযাত্রাটি সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেয়।

কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, জামায়াতে যোগ দেওয়া সাবেক বিএনপি নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ এবং জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজন ও ভুক্তভোগীদের অনেকে কর্মসূচিতেও উপস্থিত ছিলেন।

১৪ দফা দাবিগুলো হলো—

১. গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য অবিলম্বে সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডসম্মত, আন্তর্জাতিক মানের এবং ভুক্তভোগীবান্ধব আইন প্রণয়ন করতে হবে।

২. ২০২৫ সালের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, প্রতিকার ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করার যেসব বিধান ছিল, সেগুলো নতুন আইনে বহাল রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও শক্তিশালী করতে হবে।

৩. গুমের অভিযোগের তদন্ত কোনো একক পুলিশ, র‍্যাব, গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

৪. গুমের অভিযোগ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, কার্যকর ও ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন বা ব্যবস্থা গঠন করতে হবে।

৫. গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। দায়ীদের রাজনৈতিক পরিচয়, পদমর্যাদা বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কারণে কোনো ধরনের দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না।

৬. গত ১৫ বছরে সংঘটিত সব গুমের ঘটনা পুনরায় যাচাই করে নিখোঁজ প্রত্যেক ব্যক্তির বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করতে হবে। জীবিত থাকলে তাকে উদ্ধার এবং মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া গেলে পরিবারকে সত্য জানিয়ে মরদেহের সন্ধান ও যথাযথ মর্যাদায় দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৭. ‘আয়নাঘর’সহ সব গোপন আটককেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে আলামত সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নির্দেশদাতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

৮. গুম থেকে ফিরে আসা প্রত্যেক ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, সাক্ষ্য দেওয়ার সুরক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

৯. গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

১০. মিরাজ শেখের ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করে তার অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।

১১. গুম প্রতিরোধ আইনে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়ের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে কোনো কর্মকর্তা ‘আমি সরাসরি উপস্থিত ছিলাম না’—এমন অজুহাতে দায় এড়াতে না পারেন।

১২. গুম প্রতিরোধ আইন পাসের আগে ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অর্থবহ, স্বচ্ছ ও পর্যাপ্ত পরামর্শ করতে হবে।

১৩. ‘Widespread or systematic’ প্রকৃতির গুম বা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—এমন ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্তের শুরুতেই এখতিয়ার নির্ধারণের সুস্পষ্ট আইনগত পদ্ধতি রাখতে হবে। কোনো কর্তৃপক্ষ কীভাবে কোনো ঘটনাকে প্রাথমিকভাবে ‘widespread or systematic’ হিসেবে চিহ্নিত করবে, নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো মামলা ওই পর্যায়ে উন্নীত হলে তা কীভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হবে এবং তদন্ত, সাক্ষ্য, আলামত ও প্রসিকিউশনের ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে—আইনে তা স্পষ্ট করতে হবে।

১৪. আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ ব্যক্তি, সংগঠিত অপরাধী চক্র, রাজনৈতিক দল বা অন্য কোনো ‘non-state actor’-এর মাধ্যমে সংঘটিত অপহরণ, বেআইনি আটক, গোপন আটক বা গুমের ঘটনাও কার্যকর তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে আইনে স্পষ্ট সংজ্ঞা, অপরাধের শ্রেণিবিন্যাস, তদন্তের এখতিয়ার ও বিচারিক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুমের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে অপব্যবহৃত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দায়ের করা ফৌজদারি মামলাগুলো পুনঃপর্যালোচনার কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আইন নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।