tanaka

চলতি মাসে আরও ৫ কার্গো এলএনজি আমদানি করবে সরকার

দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে চলতি আগস্ট মাসে আরও পাঁচ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করবে সরকার। এসব কার্গোতে মোট প্রায় ১...
প্রচ্ছদসারাদেশ‘গামছার সঙ্গে হুক লাগিয়ে মেশিনের মাধ্যমে আমাকে ঝোলানো হয়’

‘গামছার সঙ্গে হুক লাগিয়ে মেশিনের মাধ্যমে আমাকে ঝোলানো হয়’

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র‍্যাবের টিএফআই সেলে (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল) গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জবানবন্দি দিয়েছেন চিকিৎসক আশিক উল আকবর। তিনি অভিযোগ করেছেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর হ্যান্ডকাফ খুলে হাতে গামছা বাঁধা হয়। এরপর সেই গামছার সঙ্গে হুক লাগিয়ে মেশিনের মাধ্যমে তাঁকে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) মামলার ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আশিক উল আকবর। মামলায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জন আসামি রয়েছেন।

গুমের পর নির্যাতনের অভিযোগ

জবানবন্দিতে আশিক উল আকবর বলেন, ২০১৬ সালে তিনি রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তৎকালীন সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন।

২০১৬ সালের ২৩ মে রাতে গাজীপুরের টঙ্গীতে তাঁর মামার বাড়ি থেকে সাদাপোশাকধারীরা তাঁকে তুলে নিয়ে যায় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

আশিক উল আকবর বলেন, যেখানে তাঁকে রাখা হয়েছিল, সেখানে খাবার খাওয়ার সময় এক হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হতো এবং চোখের বাঁধন কিছুটা সরিয়ে দেওয়া হতো। পেছনে একজন লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। খাবার খেতে অনীহা দেখালে মারধর করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর দাবি, পায়খানা, প্রস্রাব ও গোসলের জন্য সর্বোচ্চ তিন মিনিট সময় দেওয়া হতো। সময় বেশি লাগলে মারধর করা হতো। দিনে মাত্র দুবার তাঁকে টয়লেটে নেওয়া হতো। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি ট্রেন চলাচলের শব্দ শুনতে পেতেন বলেও জবানবন্দিতে জানান।

গামছা দিয়ে ঝুলিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ

আশিক উল আকবর বলেন, একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে মারধর করে একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করতে বলা হয়।

তাঁর অভিযোগ, এতে রাজি না হওয়ায় হ্যান্ডকাফ খুলে তাঁর হাতে গামছা বাঁধা হয়। এরপর গামছার সঙ্গে একটি হুক লাগিয়ে মেশিনের সাহায্যে তাঁকে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তাঁর ওজন বেশি হওয়ায় ঝুলিয়ে রাখার সময় দুই হাতের বগলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে। একপর্যায়ে পাশে থাকা একজন বলেন, তিনি বেশি মোটা হওয়ায় মারা যেতে পারেন। এরপর তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

পরে আবারও তাঁকে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসেবে স্বীকার করতে বলা হয়। অস্বীকার করলে দুই কানের লতিতে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। ওই সময় তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি মারা যাচ্ছেন।

ট্রাইব্যুনালে এসব ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী। তিনি বলেন, প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও ভয় থেকে একপর্যায়ে নির্যাতনকারীরা যা বলবে, তা স্বীকার করতে রাজি হন।

লিখিত স্বীকারোক্তি ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ

আশিক উল আকবরের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে একটি মুদ্রিত কাগজ ও একটি সাদা কাগজ দেওয়া হয়। আরও নির্যাতনের আশঙ্কায় তিনি মুদ্রিত কাগজের বক্তব্য দ্রুত সাদা কাগজে লিখে দেন। পরে তাঁর সেই লিখিত বক্তব্যের ভিডিও স্বীকারোক্তিও নেওয়া হয়।

এ সময় তাঁর ফেসবুক আইডি ও পাসওয়ার্ড নেওয়া হয়েছিল বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

সেখানে তাঁকে সারাক্ষণ চোখ বেঁধে এবং দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখা হতো বলে জানান আশিক উল আকবর। একদিন চোখের বাঁধন ঢিলা হয়ে গেলে একজন এসে সেটি শক্ত করে বাঁধেন। এতে তাঁর ডান চোখে তীব্র ব্যথা হয় বলে জানান তিনি।

দুই মাস গুম, ১৩ মাস কারাগারে

জবানবন্দিতে আশিক উল আকবর বলেন, একদিন তাঁকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, জমটুপি ও হেলমেট পরিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় মাইক্রোবাসে করে অন্য জায়গায় নেওয়া হয়।

পরে তাঁর হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। গুম হওয়ার পর সেদিনই প্রথম তিনি দিনের আলো দেখতে পান বলে জানান। সেখানে অনেক ক্যামেরা দিয়ে তাঁর ছবি তোলা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর দাবি, ২০১৬ সালের ২১ জুলাই তাঁকে, মাহমুদুল হাসান, নাজমুস সাকিব ও শরিয়তুল্লাহ শুভকে আসামি করে টঙ্গী থানায় একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি মামলা করা হয়।

আশিক উল আকবর বলেন, তিনি দুই মাস গুম এবং ১৩ মাস কারাগারে ছিলেন। পরে হাইকোর্টের আদেশে জামিনে মুক্ত হন। ২০২৩ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন বলেও জানান।

তিনি এ নির্যাতনের জন্য শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট র‍্যাব সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

মামলায় ১৭ আসামি

মামলার ১০ আসামি বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার তাঁদের সেখান থেকে ট্রাইব্যুনালে এনে এজলাসে তোলা হয়।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা, তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এম খুরশীদ হোসেন, মো. হারুন অর রশিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলামসহ আরও সাত আসামি পলাতক রয়েছেন।

নোট: ওপরের ঘটনাগুলো সাক্ষীর ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে করা অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে; এগুলো আদালতে প্রমাণিত চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না।