যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় নতুন নির্দেশিকা কার্যকর হলে প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) মানুষ রক্তচাপ কমানোর ওষুধের আওতায় আসতে পারেন। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকেরা বলছেন, বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা না নেওয়া প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে অন্তত একজন নতুন এই পদ্ধতির মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন। তাদের মতে, নতুন নির্দেশিকা ব্যাপকভাবে কার্যকর হলে আগামী এক দশকে লাখ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (এএইচএ) ও আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির (এসিসি) ২০২৫ সালের হালনাগাদ নির্দেশিকায় শুধু রক্তচাপের মাত্রা নয়, রোগীর সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকিকেও ওষুধ দেওয়ার সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা এএইচএর ‘প্রিভেন্ট’ ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন। এতে রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা, কিডনির কার্যকারিতা এবং আগামী ১০ বছরে হৃদ্রোগের সম্ভাব্য ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
নতুন নির্দেশিকায় কারা বেশি উপকৃত হতে পারেন?
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ মানুষ নতুন নির্দেশিকার আওতায় ওষুধের জন্য বিবেচিত হতে পারেন। এর মধ্যে আগে হৃদ্রোগের জটিলতা না থাকা এবং চিকিৎসা না নেওয়া প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে আনুমানিক ৯৭ লাখ মানুষ নতুন করে ওষুধ গ্রহণের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।
আগের পদ্ধতিতে যাদের রক্তচাপ ১৩০/৮০ মিমি পারদচাপের (mmHg) কাছাকাছি থাকত এবং যাদের তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চ হৃদ্রোগের ঝুঁকি ছিল না, তাদের অনেক ক্ষেত্রেই ওষুধের পরিবর্তে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, ব্যায়াম ও অন্যান্য জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হতো।
নতুন নির্দেশিকায় অবশ্য সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেশি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে আগেই ওষুধ শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসায় মৃত্যুঝুঁকি কমার ইঙ্গিত
গবেষকেরা ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত ‘ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভে’ (NHANES)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এরপর হিসাব করেছেন, ওই সময় নতুন নির্দেশিকাটি কার্যকর থাকলে সম্ভাব্য কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারত।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওষুধ গ্রহণের জন্য যোগ্য হওয়ার পরও যারা চিকিৎসা নেননি, তাদের তুলনায় যারা চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি আনুমানিক ২৩ শতাংশ কম ছিল। হৃদ্রোগে মৃত্যুর ঝুঁকিও প্রায় ৫০ শতাংশ কম দেখা গেছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই বিস্তৃত চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলে ১০ বছরে প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার ৬০০টি হৃদ্রোগজনিত মৃত্যু এবং সব ধরনের কারণে প্রায় ২ লাখ ৯০০টি অকালমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হতে পারত।
বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হতে পারেন। কারণ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস একসঙ্গে থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
শুধু ওষুধ নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ওষুধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
একই সঙ্গে যাদের চিকিৎসক রক্তচাপের ওষুধ দিয়েছেন, তাদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করাও জরুরি। ‘জামা কার্ডিওলজি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক উচ্চ রক্তচাপের রোগী নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন না।
ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস ধরে রাখতে প্রতিদিনের নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে ওষুধ গ্রহণের সময় মিলিয়ে নেওয়া, যেমন টুথব্রাশের পাশে ওষুধ রাখা বা অ্যালার্ম সেট করা, কার্যকর হতে পারে। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগেভাগে ঝুঁকি শনাক্তের ওপর গুরুত্ব
গবেষণাটি অল্প বয়সেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের সমন্বয় স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও অকালমৃত্যুর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে কার জন্য কখন ওষুধ প্রয়োজন, তা শুধু রক্তচাপের একটি মাত্রা দেখে নির্ধারণ করা উচিত নয়। ব্যক্তির রক্তচাপ, সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি, অন্যান্য রোগ ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াই নিরাপদ।



