লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় খাল সংস্কারের কাজ বাস্তবে শেষ না হলেও নথিপত্রে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৩০ লাখ ৩ হাজার ৫৩৬ টাকার বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে খালের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিনের পলি ও ময়লা-আবর্জনা দেখা গেলেও সেখানে প্রয়োজনীয় খনন, পাড় সংস্কার, বেড ব্লক ও টিবিএম নির্মাণের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
অসম্পূর্ণ কাজের চূড়ান্ত বিল সরেজমিনে পরিদর্শন ছাড়াই অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন (আইপিসিপি) প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ‘পি টু ডি’ এবং ‘পি টু ডি ১/১’ খাল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় বেড ব্লক ও টিবিএম অবকাঠামো নির্মাণেরও কথা ছিল। কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আম্মার ট্রেডার্স’।
অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে সামান্য কিছু কাজ করে প্রথম চলতি বিল গ্রহণ করে। এরপর মো. ইকবাল হোসেন সদর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেওয়ার পর অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই চূড়ান্ত বিল অনুমোদন করা হয়।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, হামছাদী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে আব্দুল লতিফ হাজীবাড়ি থেকে মিরশাহ্ আলম চেয়ারম্যানবাড়ি পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিটার বা ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল অংশে কোনো খনন করা হয়নি।
চেয়ারম্যানবাড়ির উত্তর পাশ থেকে সুলতান ভূঁইয়া বাড়ি পর্যন্ত আরও প্রায় এক কিলোমিটার অংশেও খালের তলদেশ খননের পরিবর্তে শুধু পানির ওপর ভাসমান ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। অথচ নথিতে এই অংশের খননকাজ শেষ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
এ ছাড়া চৌধুরীবাড়ি থেকে কালভার্ট পর্যন্ত প্রায় ১০০ মিটার অংশের দুই প্রান্তে সামান্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ দেখা গেলেও মাঝের বড় অংশটি আগের অবস্থাতেই পড়ে আছে। ফলে বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় জলাবদ্ধতার সমস্যাও কমেনি বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ।
শুধু খননকাজেই নয়, প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী খালের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা, তলদেশের ক্ষয় রোধ এবং নির্ধারিত লেভেল ঠিক রাখার জন্য নির্দিষ্ট চেইনেজে মাটির নিচে আরসিসি বা পিসিসি বেড ব্লক এবং টিবিএম স্থাপনের কথা ছিল।
সরকারি নকশা ও নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথম ও দ্বিতীয় অংশে মোট ৯টি বেড ব্লক এবং ১৮টি টিবিএম নির্মাণের কথা থাকলেও সরেজমিনে এর কোনোটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। খালের গভীরতা পরিমাপের জন্য কোনো স্থায়ী চিহ্ন বা খুঁটিও দেখা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল রাজ্জাক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খালের তলদেশে কার্যত কোনো মাটি কাটা হয়নি। ফলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় আগের মতোই জলাবদ্ধতায় পড়তে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। অথচ প্রকল্পের টাকা ঠিকাদার ও প্রকৌশলী তুলে নিয়েছেন বলে তারা শুনেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়েছে কি না, তা নথিপত্র না দেখে বলা সম্ভব নয়। পরে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানাবেন বলে তিনি জানান।
এলজিইডি লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উজ্জল চৌধুরী বলেন, চূড়ান্ত বিল প্রস্তুত করা হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী কিছু অর্থ আটকে রেখেছেন। অনিয়মের বিষয়ে লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



