মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা বুঝে তা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দক্ষ মনে করেন। কিন্তু ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনে এসে তিনিও সেই একই সমস্যার মুখে পড়েছেন, যে সমস্যায় পড়েছিলেন তার পূর্বসূরিরাও।
সম্প্রতি ট্রাম্প অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরান “অবিশ্বাস্য রকম প্রতারণাপূর্ণ” আচরণ করছে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তেহরানের রাজনৈতিক কৌশল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন বুঝতে ওয়াশিংটন এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে ইরানের টোল আদায়ের দাবি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ট্রাম্প এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইরানের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থতা শুধু ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে।
ইরানকে বুঝতে দীর্ঘ ব্যর্থতার ইতিহাস
ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি ইরানের ক্ষমতার কাঠামো ও নেতৃত্বের মনোভাব বুঝতে সমস্যায় পড়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রায় সব মার্কিন প্রেসিডেন্টই তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
সিআইএর সাবেক বিশ্লেষক ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা কেনেথ পোলকের মতে, ট্রাম্প সম্ভবত সেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝেছেন।
তার ভাষ্য, ট্রাম্প একদিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন, অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু কোনো পথই তাকে কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দেয়নি।
কার্টারের ব্যর্থতা থেকে রিগ্যানের কেলেঙ্কারি
১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানের মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি হওয়া ৫২ জন আমেরিকানকে মুক্ত করতে গোপন আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি মনে করেছিলেন, একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
পরবর্তীতে কার্টারের নির্দেশে পরিচালিত জিম্মি উদ্ধার অভিযানও ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়ার দিন একটি চুক্তির মাধ্যমে জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত হয়।
এর কয়েক বছর পর প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানও ইরানের মধ্যপন্থি নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির আশায় গোপনে অস্ত্র চুক্তিতে জড়ান। এই ঘটনা পরে ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত হয়, যা রিগ্যান প্রশাসনকে বড় রাজনৈতিক সংকটে ফেলে।
ক্লিনটন ও খাতামির অসম্পূর্ণ সুযোগ
১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থি নেতা মোহাম্মদ খাতামি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সুযোগ তৈরি হয়।
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও ইতিবাচক সাড়া দেন। তিনি কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন এবং ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত সরকার উৎখাতে সিআইএর ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
তবে ইরানের কট্টরপন্থি গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিরোধিতা করে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিও ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দেন।
ওবামার পরমাণু চুক্তি এবং ট্রাম্পের প্রত্যাহার
ইরানের সঙ্গে বড় কূটনৈতিক সাফল্য পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয় ইরান পরমাণু চুক্তি। এর আওতায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।
তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন এবং নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম বাড়ায়।
কেন যুক্তরাষ্ট্র বারবার ভুল হিসাব করে?
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় সমস্যা হলো—তারা ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে।
ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সুজান ম্যালোনির মতে, মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা বহু বছর ধরে ইরানের আদর্শিক ভিত্তি ও ক্ষমতার কাঠামোর গুরুত্বকে অবমূল্যায়ন করেছেন।
তিনি বলেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভাবও বড় সমস্যা। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতাদের সঙ্গে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা শীর্ষ কর্মকর্তা কখনো সরাসরি বৈঠক করেননি।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ডেনিস রসের মতে, “ইরানিরা আমাদের যতটা বোঝে, আমরা তাদের ততটা বুঝি না।”
তার মতে, ইরানের কৌশল হলো সময়কে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করা। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সমাধান চাইলেও তেহরান দীর্ঘমেয়াদি হিসাব করে এগোয়।
ট্রাম্পের সামনে পুরোনো সংকটের নতুন রূপ
ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি নিয়েছেন। কিন্তু সংঘাত ও চাপ বাড়ার পরও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি; বরং কট্টরপন্থিরা আরও শক্ত অবস্থানে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে বোঝার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ভুল হিসাবই আজকের সংকটকে আরও জটিল করেছে। কার্টার থেকে ট্রাম্প—প্রতিটি প্রশাসনই ভিন্ন কৌশল নিয়েছে, কিন্তু তেহরানের রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে গিয়ে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।



