টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে জেলার প্রধান দুই নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
বন্যার পাশাপাশি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে পাহাড়ধস। গত চার দিনে বন্যা ও পাহাড়ধসজনিত ঘটনায় জেলায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১৫ জন, কক্সবাজার শহরে দুইজন, চকরিয়ায় দুইজন এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে রয়েছেন।
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও ও মাতামুহুরী এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। হাজারো বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি, সবজিক্ষেত, চিংড়ির ঘের ও গ্রামীণ সড়ক প্লাবিত হওয়ায় জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অনেক এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
রামু উপজেলায় বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ঈদগড়, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল ও জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রধান সড়ক ও অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে থাকায় উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়াকাটা (ডবলতলী) এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় দুই শিশু। নিহতরা হলেন বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুমি আক্তার (১৫) এবং স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন, বন্যা ও পাহাড়ধস—দুই দুর্যোগ একসঙ্গে আঘাত হানায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক দিন ধরে গ্রামের পর গ্রাম পানিতে ডুবে থাকার মধ্যেই দুই শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সিমরান জানান, কচ্ছপিয়া ও গর্জনিয়া ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েছেন। বাড়িঘর ও সড়ক পানির নিচে থাকায় মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঈনউদ্দিন বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না এবং শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।
মাতামুহুরী ও পেকুয়ার কয়েকটি বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকায় পানি প্রবেশ করছে। বিশেষ করে কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকায় বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, টানা পাঁচ দিন সূর্যের দেখা না মেলায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। বৃষ্টি কিছুটা কমলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় পানি নামছে না।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার পরিমাপ অনুযায়ী বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা উভয় নদীর বিপৎসীমার চেয়ে বেশি। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত পাঁচ দিনে জেলায় ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থেকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।



