স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আমলকী, বিটরুট ও গাজরের মিশ্রণে তৈরি ‘এবিসি জুস’। দ্রুত ওজন কমানোর পানীয় হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বেশ প্রচার থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এই জুস পান করে স্থায়ীভাবে ওজন কমানো সম্ভব নয়। তবে সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি পরিমিত পরিমাণে এটি গ্রহণ করলে কিছু পুষ্টিগত উপকার পাওয়া যেতে পারে।
এবিসি জুস কীভাবে কাজ করে?
আমলকী, বিটরুট ও গাজর নির্দিষ্ট পরিমাণে মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই পানীয়। এতে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। জুসটি শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত পানি কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে। ফলে অল্প সময়ে ওজন কমেছে বলে মনে হতে পারে। তবে এ ধরনের ওজন কমা মূলত পানির ওজন; সরাসরি শরীরের জমে থাকা চর্বি কমানোর প্রমাণ নেই।
প্রক্রিয়াজাত বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে কম ক্যালোরির এই পানীয় গ্রহণ করলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম।
তিন উপাদানের পুষ্টিগুণ
আমলকী: ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ আমলকী শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহায়তা করে।
বিটরুট: এতে থাকা প্রাকৃতিক নাইট্রেট শরীরে রক্তপ্রবাহ ও শারীরিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে এটি তুলনামূলক কম ক্যালোরির একটি সবজি।
গাজর: গাজরে প্রচুর বিটা-ক্যারোটিন থাকে, যা শরীরে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়। এটি চোখের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সামগ্রিক পুষ্টির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে।
ওজন নিয়ন্ত্রণের বাইরে আরও যেসব উপকার
এবিসি জুসের উপাদানগুলো থেকে শরীর বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি পেতে পারে। আমলকীর ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহায়তা করে। গাজরের বিটা-ক্যারোটিন চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। অন্যদিকে বিটরুটের নাইট্রেট রক্তনালির কার্যক্রম ও ব্যায়ামের সক্ষমতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে জুসকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা ওজন কমানোর ‘ম্যাজিক ড্রিংক’ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
কতটুকু ও কখন পান করবেন?
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিমিত পরিমাণে এবিসি জুস খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ সবার জন্য এক নয়। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
জুস তৈরির পর দ্রুত পান করাই ভালো। দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করলে স্বাদ ও গুণগত মানে পরিবর্তন আসতে পারে।
সম্ভব হলে জুস ছেঁকে শুধু তরল অংশ পান না করে আমলকী, বিটরুট ও গাজরের আঁশসহ স্মুদি হিসেবে খাওয়া ভালো। এতে খাদ্যআঁশের একটি বড় অংশ বজায় থাকে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতেও সহায়তা করতে পারে।
যাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন
প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি হলেও সবার জন্য এবিসি জুস সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। বিশেষ করে—
১. কিডনিতে পাথরের সমস্যা থাকলে: বিটরুটে থাকা অক্সালেট কিছু ধরনের কিডনি স্টোনের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
২. নিম্ন রক্তচাপ থাকলে: বিটরুটের নাইট্রেট রক্তচাপ কমাতে পারে। তাই এ ধরনের সমস্যা থাকলে সতর্কতা প্রয়োজন।
৩. সংবেদনশীল পাকস্থলী বা হজমের সমস্যা থাকলে: বেশি পরিমাণে পান করলে কারও কারও পেটে অস্বস্তি হতে পারে।
৪. নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে: বিশেষ করে রক্তচাপ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ গ্রহণকারীদের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় এটি যোগ করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শুধু জুসে কমবে না পেটের মেদ
পেটের চর্বি বা দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত ওজন কমাতে কোনো একটি পানীয়ের ওপর নির্ভর করা কার্যকর পদ্ধতি নয়। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সুষম ও পরিমিত খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়াম।
এবিসি জুস খেতে চাইলে অতিরিক্ত চিনি, মধু বা অন্যান্য মিষ্টি উপাদান না মেশানোই ভালো। পাশাপাশি জুস খাওয়ার জন্য মূল খাবার বাদ দেওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় শুধু জুসের ওপর নির্ভর করাও স্বাস্থ্যকর নয়।
সুতরাং, এবিসি জুসকে ওজন কমানোর প্রধান উপায় নয়, বরং সুষম খাদ্যাভ্যাসের একটি সহায়ক অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।
সূত্র: এনডিটিভি লাইফস্টাইল



