রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নির্যাতন, মৃত্যু ও গুম প্রতিরোধে জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গঠনের বিধান রেখে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। জাতিসংঘের ‘নির্যাতনবিরোধী সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল’ (OPCAT) অনুসারে এ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে একটি বিশেষ ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে খসড়াটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক অঙ্গীকার। মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাসহ মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন, সনদ ও চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর, স্বাধীন ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন আইনটির খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।
কমিশনে থাকবেন চেয়ারপারসনসহ পাঁচ সদস্য
প্রস্তাবিত আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গঠন ও মেয়াদ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনার নিয়ে কমিশন গঠিত হবে। কমিশনে অন্তত একজন নারী সদস্য রাখার বাধ্যবাধকতাও থাকছে।
এ ছাড়া কমিশনের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নৃ-গোষ্ঠী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। বাছাই কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন আইনে কমিশনের কার্যপরিধি আরও সুস্পষ্ট করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের কার্যকর তদন্ত এবং ভুক্তভোগীর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হচ্ছে।
তদন্ত চলাকালে কোনো ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা সম্ভাব্য ক্ষতি প্রতিরোধের প্রয়োজন হলে কমিশন দ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করতে পারবে। এর ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আরও কার্যকর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
গুম ও হেফাজতে নির্যাতন ঠেকাতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা
জাতিসংঘের ‘নির্যাতনবিরোধী সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল’ অনুসারে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন, মৃত্যু কিংবা গুমের ঘটনা প্রতিরোধে জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গঠনের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় একটি বিশেষ প্রতিরোধ ইউনিট গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই ইউনিটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা ব্যক্তি বা বন্দিদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি চিহ্নিত এবং তা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো তৈরি হবে।
২০২৬ সালের নতুন ভিসা নীতিমালার অনুমোদন
একই মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘ভিসা নীতিমালা-২০২৬’-এরও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিদেশিদের বাংলাদেশে প্রবেশ ও প্রস্থান আরও সহজ, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যবসা ও দক্ষ মানবসম্পদ আকৃষ্ট করাই নতুন নীতিমালার অন্যতম লক্ষ্য।
এ ছাড়া পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতকে উৎসাহিত করা, প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর নিশ্চিত করা, জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পারস্পরিকতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা আধুনিক করার লক্ষ্যেও নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নীতিমালায় বিদ্যমান ভিসা ব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, নিরাপদ, গতিশীল ও জনবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০০৬ সালের ভিসা নীতিমালায় ভিসার ক্যাটাগরি ছিল ৩৩টি। নতুন ‘ভিসা পলিসি-২০২৬’-এ এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৪টি করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে আগের সব ভিসা-সংক্রান্ত সার্কুলার বাতিল করে একটি সমন্বিত ও আধুনিক ভিসা কাঠামো চালু করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বহির্গমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলো সমন্বিতভাবে নতুন ভিসা নীতিমালা বাস্তবায়ন করবে।



