tanaka

তিনবেলা খাবার জুটত না, এখন শাহরুখ সেজে আয় ৫ লাখ রুপি!

একসময় সাইনবোর্ড আঁকাই ছিল জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। অনিয়মিত আয়ের কারণে সংসার চালানোও ছিল কঠিন। কিন্তু চেহারায় বলিউড তারকা শাহরুখ খানের সঙ্গে অদ্ভুত মিলই...
প্রচ্ছদতথ্যপ্রযুক্তিএআই প্রত্যাখ্যানের বিষয় নয় বরং সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিতকারী মাধ্যম

এআই প্রত্যাখ্যানের বিষয় নয় বরং সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিতকারী মাধ্যম

প্রফেসর ড. শাহ জে মিয়া:এআই নিয়ে আমাদের সমাজে বর্তমানে ভালো কথার পাশাপাশি নেতিবাচক ধারণাও ছড়ানো হচ্ছে। এমনভাবে ছড়ানো হচ্ছে, যেটা শুনলে মনে হবে যে এআই খুবই খারাপ একটি ব্যাপার। নেতিবাচক ধারণা থেকে এমনটা মনে হতে পারে যে, এআইকে বা এআই দিয়ে কোনো তৈফর জিনিসকে এতটাই ঘৃণা করা যেতে পারে যে, একে সামাজিকভাবে বয়কট মনে হয় খুবই যুক্তিযুক্ত (?)। সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার তো বলেই দিয়েছেন যে এআই আগামী নির্বাচনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যখন এধাই-এর অনেক ভালো প্রযুক্তিগত ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তখন আমাদের দেশে এধাই-এর নেতিবাচক ধারণা ছড়ানো কি সঠিক ? তথ্য প্রযুক্তির এই পরিণত যুগে যখন মানুষ তার কাজ করার জন্য নির্ভেজাল সাহায্যকারী হিসেবে এআই চালিত রোবট তৈরি বা নিয়োগ করছে, তখন বাংলাদেশের মানুষকেও উন্মুক্ত মানসিকতা নিয়ে এবিষয়ে জ্ঞান অন্বেষণ ছাড়া অন্য কোনো উপায় আছে কি? আমার আজকের এই লেখা এসব আলোচনার কিছু বিষয়ভিত্তিক ধারণা উপস্থাপন করা।
শুরুতেই আমি একটি কথা বলতে চাই, তা হলো এআই এর যদি কোনো খারাপ ব্যবহার থেকে থাকে, তাহলে এআই দিয়েই সেটা প্রশমন বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যেমন, অশ্লীলতার কথা বলে ইন্টারনেটের ব্যবহার চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিলে, আমাদের সমাজ কি উন্নতি সাধনের দিকে চলতে পারবে ? ঠিক তেমনি এধাই-এর খারাপ ব্যবহারের কারণে এগুলো নিয়ন্ত্রণ না করে এর ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করে দেয়া কি সমীচীন? এই ব্যাপার নিয়ে কথা বলার এখনই সময়। এর আগেও আমি এই বিষয়ে অনেক কথা বলেছি, অনেক লেখা লিখেছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি আমি এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কথা না বলি, তাহলে মানুষ কিছু ভুল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবন যাপন করতে পারে। বস্তুত, এআই তো একটি টেকনোলজি ব্যতীত আর কিছুই নয়। আমরা যেমন ইন্টারনেট, ইনফরমেশন টেকনোলজি বা স্মার্ট মোবাইল ফোনের ব্যবহার গ্রহণ করেছি, ঠিক তেমনি আমাদের এআইকেও গ্রহণ করতে হবে। কিভাবে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনার বিষয় হতে পারে। যখন সারা পৃথিবীতে মানুষ এধাই-এর ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার থেকে শুরু করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত অনেক সুবিধা লাভ করছে, তাদের দেশের জন্য, জাতির জন্য উপকারিতা নিয়ে আসছে, তখন আমাদের দেশের মানুষকে এগুলো কিভাবে হচ্ছে তা জানা এবং বোঝা উচিত। যদি আমরা সঠিকভাবে এআই সম্পর্কিত জ্ঞান বা ধারণাগুলোকে মানুষকে সঠিকভাবে জানাতে পারি, তাহলে হয়তো একটি বড়ো সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এই নেতিবাচক প্রচারণা থেকে মুক্তি সম্ভব।
এআই বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের আগে আমাদের তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ সম্পর্কে জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই কম বেশি তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ এবং প্রয়োগ ঘটেছে। সাধারণত বলা যায় যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআই এর প্রয়োগের তুলনায় উন্নত বিশ্বে এর প্রয়োগ অনেক বেশি। যা হোক, তথ্য প্রযুক্তি বলতে আমরা সাধারণত বুঝি যে, এটি একটি উপায় যেটা কিনা তথ্যের যথাযথ ব্যবহার, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ এবং আদান-প্রদানে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে থাকে। ব্যবসা বাণিজ্যে কিংবা সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় তথ্য প্রযুক্তি বিভিন্ন প্রযুক্তির উপর ভর করে তার একগুচ্ছ কর্মপ্রণালী সম্পাদন করে থাকে। তথ্য প্রযুক্তির দরকারি অংশগুলো হলো কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস এবং সফ্টওয়্যারের মতো সরঞ্জাম, যা কিনা সংযোগ, যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কার্যপ্রণালীকে সহজ করে দেয়। আমাদের এই যুগে, প্রায় সব কিছুই তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পাদন হয়ে থাকে। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা তৈরী এবং তার উন্নতি করতে কাজ করতে চেষ্টা করি। যেমন, তথ্য ও প্রযুক্তি যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজতর করার জন্য, তথ্য আদান প্রদান করার জন্য এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নতির জন্য একটি খুবই উপকারী উপায়। শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে শুরু করে এমন কোনও ব্যবস্থা নেই যেখানে তথ্য প্রযুক্তি আমাদের সমাজে এবং ব্যক্তি জীবনের উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করেনি।
বর্তমান পৃথিবী তথ্য ও প্রযুক্তির জ্ঞান বিজ্ঞানে অনেক সামনে এগিয়ে গিয়েছে। এখন সময় এসেছে প্রতিটি তথ্য প্রযুক্তি ব্যবস্থাতে এআই (অৎঃরভরপরধষ ওহঃবষষরমবহপব – অও বা এআই) এর সাথে সংযুক্ত করার। এআই বলতে এমন একটি কম্পিউটার সিস্টেমকে বোঝায় যা সাধারণ মানুষের মতো কাজ করতে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। কোনো একটি কাজ করতে মানুষ তার বুদ্ধিমত্তাকে বিভিন্নভাবে কাজে লাগায় যেমন যুক্তি দিয়ে কিছু বোঝা বা নতুন একটি ব্যাপারকে তাড়াতাড়ি শিখে নেয়া। মানুষ যেমন সমস্যা সমাধানে তার চারপাশের সবকিছু দেখে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এআই বা এআই-চালিত রোবটগুলোও তেমনিভাবে কাজ করতে সক্ষম।
এআই আসলে এমন যে, এটি মানুষের কাজগুলোকে অটোমেশনের মাধ্যমে সফটওয়্যারে বা একসাথে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারে রূপান্তরিত করে ফেলে। আসুন জেনে আসি, কম্পিউটার সফটওয়্যার এবং হার্ডওয়্যার জিনিসটা কি? একটি কম্পিউটারের যে সকল অংশ আপনি স্পর্শ করতে পারেন এবং দেখতে পারেন, সেগুলোকে হার্ডওয়্যার বলা হয়। যেমন – মাউস, মনিটর এবং কম্পিউটার তৈরি রোবট। আর যে সকল প্রোগ্রাম বা নির্দেশাবলীর মাধ্যমে হার্ডওয়্যারকে কাজ করানো হয়, সেগুলোকে সফটওয়্যার বলা হয়, যেমন – বিভিন্ন এপ্লিকেশনস। যার ফলে সফটওয়্যারগুলো আরও ভালোভাবে আমাদেরকে সাহায্য করতে পারবে। যখন তথ্য প্রযুক্তি আধুনিক সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর গঠন করে ফেলেছে, তখন এআই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অধিকতর দক্ষতা এবং সংযোগ অর্জনের ক্ষমতায়ন করে। এখানে আমরা বলতে পারি যে, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ বিভিন্ন শিল্পে বিস্তৃত, যা কর্ম, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনের ভবিষ্যৎকে রূপ দেয়।
আসুন এধাই-এর ভালো এবং খারাপ দিকগুলো নিয়ে কথা বলার আগে, জেনে আসি এর শ্রেণীবিভাগ। এআই সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথম শ্রেণী বা ধরনটি হলো দুর্বল বা সংকীর্ণ এআই (ডবধশ অও)। এই ধরনের এআই দক্ষতার দিক থেকে খুবই দুর্বল এবং এর কার্যকারিতাগুলো সাধারণত স্বাভাবিক নিয়মাবলী সম্পর্কিত কাজের সাথে যুক্ত। যেমন দাবা খেলা বা ইংরেজি থেকে বাংলা বা অন্য যে কোনো অনুবাদ করা। পরের শ্রেণীটাকে বলা হয় জেনারেল বা সাধারণ এআই, যেটি কিনা দুর্বল এআই থেকে একটু বেশি পারদর্শী বলে মনে হতে পারে। কারণ এটি নিজে থেকেই নতুন দক্ষতা শিখতে পারে। যা হোক, এখানে বলে রাখা ভালো যে, এআইকে বা এআই-চালিত রোবটকে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ডাটার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যাতে তারা ঐসব ডাটার উপর ভিত্তি করে মানুষের কাজে সাহায্য করতে পারে। কথা হচ্ছিলো জেনারেল এআই নিয়ে। এ ধরনের এআই চালনার জন্য মানুষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন পরে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে দুর্বল এধাই-এর থেকে অনেক কম। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে টেসলা গাড়ির অটোপাইলট ফাঙ্কশন মোড। এবার আসা যাক সর্বশেষ এধাই-এর শ্রেণীবিভাগ। যেটাকে কিনা অতি বুদ্ধিমান এআই বা সুপার ইন্টেলিজেন্স (ঝঁঢ়বৎ ওহঃবষষরমবহপব) বলা হয়ে থাকে। এআই চিন্তাবিদদের মতে সুপার ইন্টেলিজেন্স একটি বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম বা সর্বজনীন রূপের প্রতিনিধিত্ব নাও করতে পারে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে এটির ব্যবহার আমাদের অজানা।
আসুন জেনে আসা যাক, এধাই-এর সবচেয়ে বহুল আলোচিত এবং সমালোচিত ব্যবহার নিয়ে। এই বিষয়টিকে ডিপফেক (উববঢ়ভধশব) কি। ডিপফেক হলো সাধারণত একটি এআই তৈরিকৃত মিডিয়া ফাইল, যেমন একটি ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং, যা দেখতে আসল বলে মনে হলেও আসলে এটি একটি বানোয়াট মিডিয়া কনটেন্ট। ডিপফেক এপ্লিকেশন একটি নতুন ধারণা, যা ডিজিটাল ব্যবসার জগতে ব্যবহারযোগ্য হলেও সমাজে এটি বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এআই ব্যবহার করে ডিপফেক কন্টেন্টগুলো সাধারণত ছবি, ভিডিও, অথবা অডিও এবং তাদের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেয়। ডিপফেক বাস্তব বা অস্তিত্বহীন বস্তু-ভিত্তিক কন্টেন্ট চিত্রিত করে ব্যক্তি বিশেষের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষতিসাধন করতে পারে। ডিপফেক কনটেন্ট-এর মধ্যে মানুষের ছবি বা ছবির মতো কিছু থাকতে পারে, যা কিনা কোনো কিছুর ব্যঙ্গার্থ ব্যবহার ধারণকে বোঝায় বা বোঝাতে পারে। এখানে বলে রাখা ভালো যে, ডিপফেক শব্দটি প্রথম ২০১৭ সালের শেষের দিকে একজন জবফফরঃ ব্যবহারকারী দ্বারা অনলাইন জগতে প্রবর্তিত হয়েছিল। এটির মূল উদ্দেশ্য হল, একটি চিত্র বা ভিডিওতে একজন ব্যক্তির সাদৃশ্য বা অন্য ব্যক্তির সাথে বা তার কাজের অদলবদল ঘটানো। ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো কন্টেন্ট বিনোদন এবং সৃজনশীলতার জন্য তৈরি করা যেতে পারে। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, এটি উল্লেখযোগ্য নৈতিক দ্বন্দ্ব ও উদ্বেগও উত্থাপন করতে পারে। বিশেষ করে যখন জনসাধারণের কাছে ভুল তথ্য বা নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই কারণেই গবেষকরা ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহারের সময় সর্বদা সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। এর মানে হচ্ছে, যা ডিজিটাল কন্টেন্টে দেখা যায় বা দেখা হয়, এখন এবং সবসময়, তা বিশ্বাসযোগ্য নাও হতে পারে।
এখন আসুন ইলেকশন কমিশনারের এআই প্রত্যাখ্যান সম্পর্কিত ব্যাপার নিয়ে কথা বলা যাক। নির্বাচন জাতির জন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয়। বিষয়ে করে এই নির্বাচনটি, যখন গত ষোলো বছর দেশে কোনো কার্যকর, অবাধ নির্বাচনের নামগন্ধও ছিল না। ডিপফেক দিয়ে এধাই-এর মাধ্যমে যে কোনো প্রার্থীর নৈতিকতা বা চরিত্র নিয়ে জনসাধারণের কাছে ভুল তথ্য বা নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়া একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। ফেক কনটেন্ট বা ডিসইনফরমেশন ছড়ানো যেমন একটি প্রত্যাখ্যাত এধাই- এর ব্যবহার, আমাদের সমাজে বিদ্যমান, তেমনি-এর প্রতিকারও এআই এর মাধ্যমেই সম্ভব। প্রচলিত অনেক এআই এপ্লিকেশন আমাদের জন্য বিদ্যমান, যার মাধ্যমে আমরা এই ধরনের এআই এর খারাপ ব্যবহার অনুধাবন এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, যে কোনো এআই টুলের মাধ্যমে আমরা ফেক কনটেন্টগুলোকে শনাক্ত করে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান-এর সাথে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। উদাহরণ স্বরূপ, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের একটি এআই প্রশাসন শাখা থাকতে পারে, যা নির্বাচনী অভিযোগ পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত কাজ করবে এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় সাধন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। এবার আসি রাজনৈতিক দলগুলো কি করতে পারে এই ব্যাপারটি নিয়ে। একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে, বিএনপি একটি এআই ল্যাব রাখতে পারে, যাতে তারা একটি ডেডিকেটেড টিমের মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে ভুয়া বিষয়বস্তু বা ফেক কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি শনাক্তকরণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলোকে চিহ্নিতকরণের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হতে পারে। এই ডেডিকেটেড টিমটি দলের ভিতরে এবং বাইরে বা জনসাধারণের কাছে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উপায় নিয়ে কাজ করতে পারে। এবিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এআই ল্যাব-এর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দলের নেতাদের এবং নির্বাচনের প্রার্থীদের ব্যক্তি ইমেজ, সুনাম সমুন্নত রাখা এবং দ্রুততার সাথে জনপ্রিয়তা নষ্টের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। এই এআই ল্যাব-এর কাছে থাকা অনেক ডিটেকশন অ্যাপ্লিকেশন সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্য যে কোনো ডিজিটাল প্লাটফর্মে ফেক নিউজ শনাক্তকরণ এবং পর্যবেক্ষণ করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে এবং আইন প্রয়োগকারী এজেন্টদের কাছে সঠিক সময়ে প্রমাণ সরবরাহসহ ইমেইলের মাধ্যমে অভিযোগ দাখিল করা সম্ভব। আমি মনে করি যে, আমাদের সমাজের কল্যাণ এবং তথ্য সুরক্ষার জন্য দ্রুত বর্ধনশীল এই ক্ষেত্রে প্রচুর প্রচেষ্টা এবং জ্ঞান প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
এছাড়াও, ডিপফেকের ইনফরমেশন ব্যবহার করে মানুষ এমন কিছু করতে পারে যা ব্যবসা ও মানুষের বা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। শিশুদের শিক্ষার অন্তরায়, সামাজিক নৈতিকতা এবং সত্যতা ও বিশ্বাসের জন্য ক্ষতিকর। এআই এর মাধ্যমে ডিপফেক প্রযুক্তির প্রভাব এবং জাল কন্টেন্ট তৈরির কারণে, আমাদের সমাজে এক ধরনের হ্যালুসিনেশন, যেটা কিনা এমন অর্থহীন বা বাস্তবিকভাবে ভুল প্রতিক্রিয়া তৈরি করাকে বোঝায়। যেটা কিনা মানুষের মধ্যে এমন কিছু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছড়িয়ে দিতে পারে, যার বস্তুত কোনো বাস্তবতা নেই। অথবা যদি থেকেও থাকে তবে তা যে কোনো সময় যে কোনো মাধ্যমে জাল ছবি বা জাল ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে জাল বা অবাস্তব চিন্তাভাবনা তৈরি করতে পারে।
এবার আসুন, অতিবুদ্ধিমান এআই বা সুপার ইন্টেলিজেন্স এর ভালো ও খারাপ নিয়ে একটু কথা বলি। অতিবুদ্ধিমান এআই বা ঝঁঢ়বৎ ওহঃবষষরমবহপব হল বিশেষ ধরনের ভবিষ্যদ্বাদী ব্যবস্থা। এটি হলো একটি বিশেষ শ্রেণীর যা কিনা স্বাভাবিকের থেকে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন হিউমান কগনিটিভ ফাঙ্কশন বা মানুষের জ্ঞানীয় কার্যকারিতা প্রকাশ করে। এই ধরনের এআইকে একটি কাল্পনিক সফটওয়্যার-ভিত্তিক এআই বা এআই-চালিত রোবটিক সিস্টেমও বলা যেতে পারে। আইবিএম এর তথ্য গবেষণা অনুযায়ী আমরা বলতে পারি যে, অতি বুদ্ধিমান এধাই-এর পরিধি মানুষের বুদ্ধিমত্তার বাইরেও বিস্তৃত। এই জন্য মনে করা হচ্ছে যে, এই অতিবুদ্ধিমান এআই অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক এই যুগে অবদান রাখতে সক্ষম। কারণ এর চিন্তাভাবনার দক্ষতা যে কোনো মানুষের চেয়েও অনেক উন্নত। যদিও এটা কাল্পনিকভাবেই বলা হচ্ছে, তবুও এর বিশ্বাসযোগ্যতা এখন মানুষের সামনে অনেকটা পরিষ্কার এবং ভবিষ্যতে আরো গ্রহণযোগ্য হতে চলেছে। এসম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়গুলি নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করে চলছি।
এই অতি বুদ্ধিমান এআই তৈরির একটি বড়ো পদক্ষেপ হলো শক্তিশালী ডিপ লার্নিং ভিত্তিক এলগোরিদম। এই ব্যবস্থাটাকে বলা হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাস্তবসম্মত এআই ব্যবস্থা যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকে অনেকগুণে বাড়াবে। এই ধরনের এআই ব্যবস্থা মানুষকে তাদের আশপাশের পৃথিবীকে বা সমাজকে বুঝতে এবং তার থেকে সমস্যার সমাধান করতে সক্ষমতা আনয়ন করবে। ধারণক্ষমতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে এই বুদ্ধিমত্তা হবে অত্যন্ত বিকশিত। কিন্তু যেহেতু আমরা ভবিষ্যৎ আধুনিক যুগ সম্পর্কে এখনো পরিপূর্ণ ওয়াকিবহাল না, তাই কিছু গুরুত্বপূর্ণ এআই প্রযুক্তির বিকাশ এখনো হয়নি। এখানে বলে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, অতি বুদ্ধিমান এআইকে বিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং বিকাশের জন্য বিশাল তথ্যভান্ডারের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে। এই তথ্যভান্ডারটি হতে হবে সার্বজনীন এবং সর্বগ্রহণযোগ্য। আমাদের সমাজে তা না হলে অতি বুদ্ধিমান এআই সহজেই বিভেদ সৃষ্টি করবে এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটবে।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, ধরে নেয়া যাক, কোনো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (খখগ) একটি অতি বুদ্ধিমান এআই হিসেবে যে কথোপকথনের ডাটা থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হলো, সেখানে শুধু পুরুষদের দ্বারা তৈরি বা তাদের সম্পর্কিত কথার ডাটা ব্যবহৃত হয়েছিল। এই লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল কখনোই সমাজের সব ধরনের মানুষের সার্বজনীন জ্ঞানকে ধারণ করতে অপারগ হবে। কারণ নারী, শিশুরা ও অন্যান্য লিঙ্গের মানুষেরাও আমাদের সমাজের অংশ। অতি বুদ্ধিমান এআই সহজেই একপেশে আচরণ করতে পারে যদি তার প্রশিক্ষণ ডাটা সঠিক না হয়। তাই এর প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, মানুষের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে, এবং সর্বোপরি প্লানেটোরি নেসেসিটি (চষধহবঃধৎু হবপবংংরঃু) নামে একটি কথা আছে যেটা কিনা বাধাগ্রস্ত হবে।
প্লানেটোরি নেসেসিটি আর অন্য কিছুই নয়, এটি মানুষের সমাজের বেঁচে থাকার স্বাভাবিক নিয়মকানুন, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ন্যায় নীতির সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতাকে বোঝায়। এআই প্লানেটোরি নেসেসিটির অনেক কিছুকেই ইতোমধ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
এআই এর অপর একটি বহুল প্রচলিত এপ্লিকেশন হচ্ছে, রোবটিক প্রসেস অটোমেশন (জড়নড়ঃরপ চৎড়পবংং অঁঃড়সধঃরড়হ – জচঅ)। যার মাধ্যমে বিজনেস প্রসেস বা প্রক্রিয়াগুলোকে স্বয়ংক্রিয় এবং বুদ্ধিমান বানানো হয়ে থাকে। এই এআইটির মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অটোমেশন উভয়ের মাধ্যমে মানব কর্মীদের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সম্পাদনে পদ্ধতিকে সহজতর করা হয়ে থাকে। আরপিএ ব্যবহারের মাধ্যমে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে বা ইন্ডাস্ট্রিতে স্মার্ট অটোমেশনের মাধ্যমে তথ্য আহরণ, ফর্ম পূরণ, ফাইল স্থানান্তর এবং আরও অনেক কিছুর মতো জটিল এবং সময় সাপেক্ষ কাজ নিয়মানুগ (ঝুংঃবসধঃরপ) পদ্ধতিতে সম্পাদন করা যায়। এই ধরনের অটোমেশন এধাই-এর বিভিন্ন মেথড ব্যবহার করে তাদের কার্যকারিতা প্রসারিত করে। স্মার্টকরণের ধারাবাহিকতায় বুদ্ধিমান প্রক্রিয়া অটোমেশনের জন্য আরপিএ সাধারণ নিয়ম-ভিত্তিক সিস্টেমের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে থাকে। আরপিএ-কে এমন একটি সিস্টেম, যেখানে এধাই-এর অংশ হিসেবে মেশিন লার্নিং যথাক্রমে “চিন্তাভাবনা” এবং “শেখার” বিষয়গুলিকে সমন্বয় সাধন করে থাকে। এটি ডেটা ব্যবহার করে অ্যালগরিদমগুলিকে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে সফ্টওয়্যারটি দ্রুত এবং আরও দক্ষ উপায়ে কাজগুলি সম্পাদন করতে পারে। অনেকগুলো এধাই-এর ভালো ব্যবহারের মধ্যে একটি হলো ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। এটিকে প্রায়শই ভিআর বলা হয়। এটি একটি দুর্দান্ত এআই ব্যবস্থা যা কোনো বস্তুর অবস্থান এবং অনুভূতি একসাথে প্রকাশ করতে পারে। ভিআর এআই অ্যালগরিদম-এর মাধ্যমে ছবি, শব্দ এবং অন্যান্য অনুভূতি তৈরি করে থাকে, যার মাধ্যমে বস্তুর বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান, ব্যবহার এবং অন্যান্য অনুভূতির প্রকাশ পরিপূর্ণভাবে সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ভার্চুয়াল গেমিং। ভিআর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য একটি বিশেষ হেডসেট ব্যবহার করা হয়। এই হেডসেটে ভার্চুয়াল জগৎকে দেখানোর জন্য স্ক্রিন এবং শব্দের জন্য স্পিকার রয়েছে। মাথা নাড়ানোর সাথে সাথে হেডসেটের স্ক্রিনে ছবিগুলির অবস্থান ও সেই সাথে শব্দেরও পরিবর্তন হয়। এর অর্থ হল এগুলি এমন একটি অনুভূতি সৃষ্টি করে যেন মানুষ ভার্চুয়াল জগতের জিনিসগুলিকে স্পর্শ করছেন। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) থেকে আলাদা। এআর মানুষকে চারপাশের বাস্তব জগৎকে দেখায় তবে এর সাথে কম্পিউটার-উৎপাদিত গ্রাফিক্সও যুক্ত করে। ভিআর বাস্তব বা কাল্পনিক স্থানের উপর ভিত্তি করে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল জগৎ তৈরি করে।
নতুন এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, শিশু এবং তরুণরা বেশিরভাগ কোম্পানির জন্য একটি মূল বিপণন ফ্যাক্টর। তরুণরা ভিআর ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তরুণ খেলোয়াড়কে ভিআর গেমগুলো এমনভাবে উপভোগ করতে দেয় যেন তারা এটি বাস্তবেই উপভোগ করছে। অনেক তরুণদের জন্য ডিজিটাল সামাজিকীকরণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আর ভিআর সামাজিকীকরণের মাধ্যমে ভার্চুয়াল স্পেসে অন্য ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করার অনুমতি দিয়ে এটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। এটি একজন তরুণকে তাদের বন্ধুদের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে এবং ভার্চুয়ালি একসাথে বস্তুগুলি থেকে অনুভূতি সৃষ্টি এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে দেয়। পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয় আজকাল এইসব ভার্চুয়াল এধাই-এর ব্যবহারের মাধ্যমে ছাত্রদের বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা প্রদানের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
উপসংহারে বলতে পারি যে, এআই হচ্ছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যাডভান্সড তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যম, যার ভবিষ্যৎ যুগোপযোগী প্রয়োগ দিন দিন বেড়েই চলছে। আগামী বছরগুলোতে এধাই-এর প্রয়োগ এবং এর গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক আকারে পরিলক্ষিত হবে। এআই অনেক ধরনের টেকনোলজি ব্যবহার করে থাকে যার মাধ্যমে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ইন্ডাস্ট্রিতে মানুষের পাশাপাশি এআই-চালিত রোবটের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে মানুষের কাজের গতি এবং সমন্বয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। এসব বিষয়ের উপর জ্ঞান এখনো অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের কাছে অজানা বা পরিষ্কার না, কারণ এখনও অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে এসব বিষয় নিয়ে। আজ এখানেই শেষ করছি। অন্যদিন আবার অন্য কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয় নিয়ে আলোচনা উপস্থাপন করার আশা রাখছি। ধন্যবাদ।
লেখক : প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স এন্ড অ্যাপ্লাইড এআই;
উপপরিচালক, সেন্টার ফর অ্যাপ্লাইড এন্ড রেস্পন্সিবল এআই