কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে শুধু আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ছিল না বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। অপ্রতিমের সঙ্গে আটক তুহিনের আগে থেকেই পরিচয় ও একসঙ্গে চলাফেরা ছিল। তাদের মধ্যে কিছু বিরোধও ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই অপ্রতিমকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লার কোটবাড়ী ও সালমানপুর এলাকায় ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। তদন্তকারীরা সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মাদক সিন্ডিকেট, কিশোর গ্যাং, আইফোন ছিনতাই এবং অপ্রতিমের মায়ের ওপর কোনো পক্ষের ক্ষোভ—এসব বিষয়ও বিবেচনায় রেখেছেন। তবে এসব সম্ভাবনার কোনোটি এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর ওই এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের দেখা হয়। এ ছাড়া অপ্রতিমের মুঠোফোনের যোগাযোগের তথ্যেও তুহিনের সঙ্গে তার যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে শুধু আইফোনের কারণে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে—এমন তথ্যের চেয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের পূর্বপরিচয় এবং তাদের মধ্যকার বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। এসব বিষয় নিয়ে ঘটনার দিন তুহিন অপ্রতিমকে ডেকে নিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপরই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
তদন্তে পাওয়া আলামত ও তথ্যের একটি অংশ থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোনকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে হত্যার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছের একটি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরকে দেখা যায়। ওই কিশোরের বয়স অপ্রতিমের তুলনায় বেশি ছিল এবং তার মাথায় ক্যাপ ছিল। ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে তার চলাফেরা দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজেও ওই কিশোরকে অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে যেতে দেখা যায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে কিশোরটির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। লাশ উদ্ধারের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা তার বাড়িতেও যান।
পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হলে শনিবার দুপুরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর কোটবাড়ী এলাকা থেকে ওই কিশোরকে আটক করে ডিবি পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাত ৮টার দিকে সালমানপুর এলাকায় তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে তুহিনের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ও তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এর মধ্যে টাকা ও মোটরসাইকেল আত্মসাৎ, মাদক এবং কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল আত্মসাতের অভিযোগে থানায় একটি অভিযোগও করা হয়েছিল।
জানা গেছে, মো. তুহিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম নুরুল আলম। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তাকে আটক করে পুলিশ।
পুলিশের অনুসন্ধানে পাওয়া একটি অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গত বছরের ২৬ এপ্রিল সদর দক্ষিণ মডেল থানায় তুহিনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ভুক্তভোগী সোহাগের সঙ্গে তুহিনের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। গত ২৭ মার্চ সোহাগ কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার সিটি বাইক থেকে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি সুজুকি মোটরসাইকেল কেনেন। পরে তুহিন মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন সোহাগ।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পেছনে এসব ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।



