tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকমধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তানমধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তান

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তানমধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তান

গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের কাছে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই ভিন্ন। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তার উদ্যোগে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের সাক্ষী হতে রিয়াদে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের এই প্রভাবশালী সেনাপ্রধান।

জেনারেল মুনিরের জন্য ওই চুক্তি ছিল বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য। চুক্তির আওতায় তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান সৌদি আরব থেকে বিপুল বিনিয়োগ ও ঋণ পাওয়ার সুযোগ পায়। বিনিময়ে সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি দেশটির নিরাপত্তায় পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। সৌদি ভূখণ্ডে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা হলে পাকিস্তান দেশটির সুরক্ষায় এগিয়ে আসবে—এমন ব্যবস্থাও রাখা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সে সময় ইসলামাবাদের হিসাব ছিল তুলনামূলক সরল। তাদের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক দ্রুত স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে এবং মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা কমে আসবে।

কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই হিসাব বদলে যায়। ফেব্রুয়ারি নাগাদ পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করে। পাল্টা জবাবে ইরান সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

এর প্রভাব পড়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের পুরোনো সংঘাতেও। দীর্ঘদিন ধরে চলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে। চলতি মাসের শুরুতে হুথিরা ইয়েমেনে উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ডগত সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি সৌদি আরবেও ড্রোন ও হামলা চালায়। জবাবে সৌদি আরব ইয়েমেনে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় আকারের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে চাপে পড়েছে পাকিস্তানও। গত আগস্টে সৌদি আরবের সঙ্গে করা সামরিক চুক্তিতে তুরস্ককে যুক্ত করা হয় এবং এর নতুন নাম দেওয়া হয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা বাকি দুই দেশের ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।

লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘আমার মনে হয় না আসিম মুনির আঞ্চলিক ঝুঁকির মাত্রা সঠিক হিসাব করতে পেরেছিলেন। পাকিস্তানের সৈন্যদের এত দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে নামাতে হতে পারে, তা তিনি হয়তো ভাবেননি।’

সৌদির পাশে দাঁড়ানোর চাপ

সৌদি আরবের হাতে বিপুল অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম থাকলেও হুথিদের মতো কৌশলী যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে দেশটির অভিজ্ঞতা সীমিত। অন্যদিকে ভারতের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে সংঘাত মোকাবিলায় অভ্যস্ত পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক বেশি।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সৌদি আরব যদি হুথিদের বিরুদ্ধে ‘মক্কা চুক্তি’ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পাকিস্তানের ওপর সামরিক সহায়তা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। এমনকি প্রশিক্ষণের কাজে সৌদি আরবে অবস্থানরত হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনাকেও যুদ্ধের ময়দানে পাঠানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও পাকিস্তান সৌদি আরবের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সম্প্রতি সৌদি আরব পাকিস্তানকে জরুরি ৮ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ও বিনিয়োগ দিয়েছে।

পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি ইসলামাবাদ ‘অনড়’ ও ‘নিঃশর্তভাবে’ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশটির প্রতিরক্ষায় পাকিস্তান ‘যেকোনো সীমা পর্যন্ত’ যেতে প্রস্তুত বলেও তারা জানিয়েছেন।

তবে প্রকাশ্য এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি ইতোমধ্যে চাপের মুখে। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গে সংঘাত এবং সীমান্ত এলাকায় জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন সংকট

‘মক্কা চুক্তি’ কার্যকর হলে ইরানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার আগে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক তুলনামূলক ভালো ছিল।

সেই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে জেনারেল আসিম মুনির তেহরানকে আলোচনার টেবিলে এনে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইরানের ওপর পাকিস্তানের অসন্তোষ যেমন বেড়েছে, তেমনি ইসলামাবাদের ওপর তেহরানের আস্থাও কমেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

আয়েশা সিদ্দিকার মতে, হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তান সরাসরি যুক্ত হলে এর বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ও সামাজিক প্রভাব পড়তে পারে। ইরানের পর পাকিস্তানেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে। ফলে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী অংশ নিলে দেশটির ভেতরে সুন্নি-শিয়া উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে আফগান সীমান্তে পাকিস্তানি তালেবানদের সহিংসতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানসংলগ্ন বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনও নতুন মাত্রা পেতে পারে।

পার্লামেন্টে আলোচনা হয়নি চুক্তি নিয়ে

পাকিস্তান সিনেটের বিরোধীদলীয় নেতা রাজা নাসির আব্বাসের দাবি, ‘মক্কা চুক্তি’তে ঠিক কী কী শর্ত রয়েছে, তা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কয়েকজন ছাড়া অন্যদের কাছে স্পষ্ট নয়। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর প্রভাবের কারণে চুক্তিটি পার্লামেন্টেও আলোচনা করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘পাকিস্তান যদি এই যুদ্ধে ঝাঁপ দেয়, তবে তা দেশের জন্য মহাবিপর্যয় নিয়ে আসবে। আমরা ইতোমধ্যে দুটি রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ সামলাচ্ছি; অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী। এই সংঘাতের এক পক্ষে যোগ দিলে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি হবে।’

তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো সুনির্দিষ্ট শর্ত প্রকাশ্যে আসেনি, যার কারণে ‘মক্কা চুক্তি’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে যাবে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তান হয়তো আশা করছে—হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযান বাড়লেও রিয়াদ সরাসরি ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াবে না। চুক্তির আরেক অংশীদার তুরস্কও এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে আগ্রহী নয় বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।

ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজ’-এর পরিচালক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, ‘ইয়েমেনের মাটিতে যেকোনো ধরনের পদক্ষেপে যুক্ত হওয়া এড়াতে পাকিস্তান তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দাবি, সৌদি ক্রাউন প্রিন্সও এই মুহূর্তে চুক্তিটি সক্রিয় করতে চান না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সৌদি আরব যদি স্থলবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, পাকিস্তান হয়তো তাদের সহায়তা দেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত ছাড়া সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করবে না। ট্রাম্প প্রশাসন এই মুহূর্তে নতুন কোনো যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলতে আগ্রহী নয়; তারা হুথিদের সঙ্গে আলোচনার পথই খোলা রাখতে চায়।’

তবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।