ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ এরই মধ্যে ছয় মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও তেহরানকে নতি স্বীকার করাতে পারেননি তিনি। একই সঙ্গে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি গ্রহণযোগ্য পথও এখনো খুঁজে পাননি।
রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক হামলার পরও ইরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পকে কঠিন এক পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই বিজয়ের দাবি করলেও ছয় মাস পর এসে ট্রাম্পের সামনে এখন মূল প্রশ্ন—কীভাবে সংঘাত শেষ করবেন, অথচ তা যেন পরাজয় বা বড় ধরনের ছাড় হিসেবে না দেখা হয়।
দুই কঠিন বিকল্পের মাঝে ট্রাম্প
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বর্তমানে মূলত দুটি বিকল্পের মধ্যে আটকে আছেন। প্রথমটি হলো ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনাধীন একটি মধ্যবর্তী সমঝোতা মেনে নেওয়া। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ বা তদারকির একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় বিকল্প হলো ট্রাম্পের দেওয়া সামরিক হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করে ইরানে আবারও বড় ধরনের বিমান হামলা চালানো। তবে এতে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম বিকল্প গ্রহণ করলে তা হবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর তেহরানকে দেওয়া সবচেয়ে বড় ছাড়গুলোর একটি। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিকল্পে গেলে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারেন।
এ ছাড়া গত ছয় মাসে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নতি স্বীকার করাতে পারেনি। ফলে নতুন করে বড় হামলা চালালেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো বর্তমান পরিস্থিতি বা ‘স্ট্যাটাস কো’ বজায় রাখা। অর্থাৎ ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত রাখা এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলা হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া। তবে এই পথও ট্রাম্পকে সম্মানজনকভাবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার নিশ্চয়তা দেবে না।
ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সমঝোতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ট্রাম্পের সামনে থাকা বিকল্পগুলো মূলত ‘খারাপ বিকল্পের একটি তালিকা’। তবে তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে, অনির্দিষ্টকাল ধরে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতেই হবে, আর সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন বাস্তবতাকে স্বীকার করার বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।
হরমুজ প্রণালি নিয়েই বড় সংকট
হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করাকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, তেহরানকে নতি স্বীকার করাতে ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুমকি ততটাই কম কার্যকর বলে মনে হচ্ছে।
এ অবস্থায় বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প নিজেই হয়তো বড় ধরনের সমঝোতার দিকে এগোচ্ছেন। বিশেষ করে প্রণালির দুই পাশে অবস্থিত ইরান ও ওমানের মধ্যে কোনো সমঝোতা চূড়ান্ত হলে সেটি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র এবং দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর তেহরান কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে। ট্রাম্প অবশ্য দাবি করছেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। তবে ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিষ্পত্তি হওয়া বাকি।
শান্তি চুক্তি নিয়েও সংশয়
ইরান ও ওমানের মধ্যে কোনো সমঝোতা বাস্তবায়িত হলেও এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা আবার শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি হবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
এর অন্যতম কারণ, জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতা দ্রুত ভেঙে পড়েছিল। ওই সমঝোতার আওতায় ইরান কিছু নিষেধাজ্ঞা থেকে প্রাথমিকভাবে ছাড় পেয়েছিল, যা ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজনের সমালোচনার মুখে পড়ে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখন ক্রমেই ধরে নিচ্ছেন যে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ও সংঘাত কোনো না কোনোভাবে অব্যাহত থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সেপ্টেম্বর থেকেই আগাম ভোট শুরু হবে।
এটি ট্রাম্পের জন্য বাড়তি রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রচারে তিনি বিদেশি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হওয়া কমানো এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। একই সময়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকানদেরও কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে।
তবে মার্কিন ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কোনো ‘পরিবর্তনশীল জনমত জরিপ’ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না।
যুদ্ধের মূল লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে?
ট্রাম্প নিয়মিতভাবে ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার বিষয়টিকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্যগুলোর অনেকটাই এখনো অর্জিত হয়নি।
গত শনিবার ট্রাম্প জানান, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা কূটনীতিকে আরও একবার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করায় তিনি নতুন করে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। তবে একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ইরানের ওপর আরও কঠোর হামলা চালানো হবে।
কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, নতুন হামলা থেকে সরে আসার পেছনে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকতে পারে। যদিও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
এর মধ্যেই বুধবার লাস ভেগাসে এক রাজনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প ইরান নিয়ে আবারও দ্বৈত বার্তা দেন। তিনি বলেন, তিনি চুক্তি করতেই বেশি পছন্দ করবেন, কারণ তিনি মানুষ হত্যা করতে চান না। তবে কোনো এক পর্যায়ে চুক্তি করতেই হবে বলেও ইঙ্গিত দেন।
উপসাগরীয় মিত্রদেরও সতর্ক করেছে ইরান
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা ওয়াশিংটনের মিত্রদের জ্বালানি অবকাঠামোয় পাল্টা হামলা চালানো হবে বলে ইরান সতর্ক করেছে।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফের মতে, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা আগামী বছরগুলোতে কোথায় দাঁড়াবে, তারা এই সংঘাত থেকে সে বিষয়ে শিক্ষা নিচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
এমনকি ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধকে সমর্থন করা কট্টরপন্থিদের কেউ কেউ এখন সতর্কতার পরামর্শ দিচ্ছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইরানবিরোধী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের বেনাম বেন তালেবলু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরান নভেম্বরের আগেই ট্রাম্পকে একটি উভয় সংকটে ফেলতে চাইছে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত কোনো সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো না করা।
সব মিলিয়ে, ছয় মাসের যুদ্ধের পর ট্রাম্পের সামনে এখন সহজ কোনো পথ খোলা নেই। নতুন করে বড় হামলা চালালে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, আর সমঝোতায় গেলে তা ইরানের প্রতি ছাড় হিসেবে দেখা হতে পারে। ফলে যুদ্ধ শেষ করে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি ‘বিজয়’ দাবি করার পথ খুঁজে পাওয়াই এখন ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



