মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ‘অপ্রত্যাশিত’ নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করেন। তবে ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে যুদ্ধের সময়সীমা ও লক্ষ্য নিয়ে তার পরিবর্তনশীল বক্তব্য একটি বাস্তবতাকেই সামনে আনছে—দ্রুত এমন একটি সমাপ্তি, যেটিকে তিনি স্পষ্টভাবে ‘বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন, তা এখনো অধরাই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার দাবি এবং দেশজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলার পরও তেহরান নেতৃত্ব অবিলম্বে আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। বরং ইরান শুধু মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বেসামরিক স্থাপনাতেও পাল্টা আঘাত হানার হুমকি দিচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করার সতর্কবার্তা দিয়ে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ইরানের বার্তা স্পষ্ট
তেহরান জানিয়ে দিচ্ছে—তাদের প্রতিরোধ সক্ষমতা এখনো অটুট এবং যেকোনো যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার আগে তারা একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চায়।
এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাবনা সামনে চলে এসেছে, যা ট্রাম্প তার দুই মেয়াদের প্রেসিডেন্সিতে সাধারণত এড়িয়ে চলেছেন। হয়তো এ কারণেই তার বক্তব্যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে। কখনও তিনি বলেন, যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হতে পারে; আবার কখনও পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময়ের ইঙ্গিত দেন।
একদিকে তিনি এই সংঘাতকে ইরানি জনগণের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে বর্তমান শাসন কাঠামোর অংশবিশেষ তার শর্ত মেনে নিলে তাদের সঙ্গেই সমঝোতায় রাজি থাকার কথাও জানাচ্ছেন। সমালোচকদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনায় তার অনাগ্রহকেই ইঙ্গিত করে।
এর আগে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযানেও দ্রুত ফল না মিললে ওয়াশিংটন সমঝোতার পথেই হেঁটেছিল। সে চুক্তিতে মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ হলেও আঞ্চলিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত সংঘাতের ঝুঁকি ভিন্ন মাত্রার—বাড়তি মার্কিন হতাহত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন সংগঠনে হোয়াইট হাউস খুব বেশি সময় ব্যয় করেনি, ফলে অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে।
দুর্বল কিন্তু ভেঙে পড়েনি ইরান
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় ইরান অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকলেও কয়েক দশকে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কেবল আকাশপথের শক্তি দিয়ে ভেঙে ফেলা সহজ নয়।
ট্রাম্প ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’-এর কথাও উল্লেখ করেছেন—যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন বাহ্যিক চাপের মাধ্যমে ঘটবে বলে ধারণা করা হয়। এতে Nicolás Maduroর প্রসঙ্গও এসেছে তুলনায়। তবে ইরানের বাস্তবতা ভিন্ন এবং জটিল।
তেহরানের আশঙ্কা, প্রতিরোধ গড়ে না তুলে দ্রুত চুক্তিতে গেলে ভবিষ্যতে আবারও নতুন অজুহাতে হামলা হতে পারে—যেমন ইসরাইলের তথাকথিত ‘ঘাস কাটা’ কৌশল, যেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর আঘাত করে প্রতিপক্ষকে দুর্বল রাখা হয়।
এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন—তিনি চাইলে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালাতে পারেন, আবার চাইলে কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি ‘শেষ’ করতে পারেন। এই অস্পষ্ট অবস্থান তাকে কৌশলগত নমনীয়তা দিলেও মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়ের মধ্যেই অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে যায়, তবে সীমিত সামরিক সাফল্যকেই বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরে দ্রুত সরে আসার পথও বেছে নিতে পারেন ট্রাম্প।
তবে এমন সিদ্ধান্তের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী—মধ্যপ্রাচ্যে আরও অস্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
সূত্র: আল জাজিরা।



