tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকইউক্রেন যুদ্ধে প্রতি মাসে নিয়োগের চেয়ে ৬ হাজার বেশি সেনা হারাচ্ছে রাশিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধে প্রতি মাসে নিয়োগের চেয়ে ৬ হাজার বেশি সেনা হারাচ্ছে রাশিয়া

প্রথম নিউজ২৪ ডেস্ক: ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া প্রতি মাসে যত সেনা হারাচ্ছে, তার তুলনায় প্রায় ৬ হাজার কম সেনা নিয়োগ দিতে পারছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমা কর্মকর্তারা। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মস্কো এখনো দ্রুতগতিতে নতুন সেনা নিয়োগ অব্যাহত রাখলেও সাম্প্রতিক দুই মাসে সেই নিয়োগ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত ও আহত সেনাদের ক্ষতি পূরণে যথেষ্ট হচ্ছে না। খবর দ্য গার্ডিয়ানের

এক পশ্চিমা কর্মকর্তা জানান, রুশ বাহিনীর হতাহত সেনার সংখ্যা এবং নতুন করে নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের মধ্যে ব্যবধান বর্তমানে মাসে প্রায় ৬ হাজার। যদিও রাশিয়া প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার নতুন সদস্য সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করছে, তবু সামগ্রিকভাবে সেনা ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না।

পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিস্থিতিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে বিকল্পও সীমিত। নতুন করে বড় ধরনের সেনা সমাবেশের ঘোষণা দিলে তা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

২০২২ সালের শরতে রাশিয়া সর্বশেষ বড় পরিসরে সেনা সমাবেশ করেছিল। সে সময় প্রায় ১০ লাখ রুশ নাগরিক দেশ ছেড়ে চলে যান। তাদের একটি বড় অংশ ছিলেন উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, পরে তাদের অর্ধেকেরও কম রাশিয়ায় ফিরে গেছেন।

এদিকে কয়েক লাখ নতুন সেনা নিয়োগ করা হলেও তাদের প্রশিক্ষণ, যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহের সক্ষমতা রুশ সামরিক বাহিনীর রয়েছে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

সেনা ঘাটতির মধ্যেই রাশিয়া ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পশ্চিমা কর্মকর্তারা। তাদের হিসাবে, জুলাইয়ের শুরু থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ৩৬০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে কিয়েভের দুর্বলতার সুযোগ মস্কো কাজে লাগাচ্ছে বলেও তাদের দাবি।

পশ্চিমা কর্মকর্তাদের ধারণা, শীত মৌসুমে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে দেশটির মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়াই রাশিয়ার অন্যতম লক্ষ্য।

অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে রাশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। একই সময়ে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের জন্য মিত্রদের কাছে আরও সহায়তা চেয়ে আসছে কিয়েভ।

এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম চলতি সপ্তাহে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে কিয়েভে গিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি জানান, ব্রিটিশ তৈরি দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত উপাদান সম্পর্কে আগে গোপন রাখা কিছু তথ্য ইউক্রেনকে দেবে যুক্তরাজ্য।

ইউক্রেনের ওপর রুশ হামলা প্রতিহত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সহায়তা প্রয়োজন বলেও আহ্বান জানিয়েছেন বার্নহাম। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। আগামী মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও বিষয়টি তিনি তুলে ধরতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে রাশিয়া। ইউক্রেনের ভেতরে ও বাইরে ব্রিটিশ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকিও দিয়েছে রুশ পক্ষ।

তবে পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়ার এসব হুমকি বাস্তব হলেও পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। তাদের মূল্যায়ন, পুতিন সরাসরি ন্যাটোর সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চান না।

এক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাজ্যকে ঘিরে রাশিয়ার সাম্প্রতিক বৈরী বক্তব্য ও বিভিন্ন অভিযোগ দীর্ঘদিনের রুশ সামরিক কৌশলেরই অংশ। প্রতিপক্ষের মধ্যে ভয় তৈরি করা এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে মস্কো নিয়মিত এ ধরনের বক্তব্য ব্যবহার করে।

পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, সাইবার হামলা কিংবা প্রক্সি গোষ্ঠী ব্যবহার করে কারখানা ও গুদামের মতো বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালানোর সক্ষমতা রাশিয়ার রয়েছে। গত বছর ইউক্রেনকে সহায়তা পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত পূর্ব লন্ডনের একটি গুদামে রাশিয়ার নির্দেশে হামলার ঘটনায় ছয়জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে পুতিন এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাত্রা সীমিত রাখবেন। তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের সামগ্রিক কৌশল হলো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। এর মাধ্যমে ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে রাশিয়ার হুমকির কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জনগণের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পশ্চিমা দেশগুলোর ঐক্যে ফাটল ধরতে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়ার এসব হুমকিকে এমন একটি ইউরোপ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত, যা আরও বিভক্ত এবং আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

আরেক কর্মকর্তা মনে করিয়ে দেন, ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন বন্ধ করতে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে রাশিয়া বহু বছর ধরেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলে আসছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান