tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ: প্রিয়জনের স্মৃতি আঁকড়ে অনন্ত অপেক্ষা

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ: প্রিয়জনের স্মৃতি আঁকড়ে অনন্ত অপেক্ষা

প্রথম নিউজ২৪: একজন মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ। থানায় মামলা নেই, আদালতে হাজির করা হয়নি। কোথায় আছেন, কেমন আছেন, বেঁচে আছেন কি না—কোনো প্রশ্নেরই উত্তর নেই। দিন গড়ায়, মাস পেরোয়, বছর চলে যায়; তবু শেষ হয় না অপেক্ষা।

গুম হয়ে যাওয়া স্বজন একদিন ফিরে আসবেন—এই আশায় আজও দিন কাটাচ্ছেন হাজারো পরিবার। প্রিয়জনের ছবি, ব্যবহৃত পোশাক কিংবা স্মৃতিই হয়ে উঠেছে তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। কেউ প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন, কেউ ফোনের অপেক্ষায় থাকেন—এই বুঝি প্রিয়জনের কোনো খবর এলো। কিন্তু অনেকের সেই অপেক্ষার আজও শেষ হয়নি।

এমন এক দুঃসহ বাস্তবতার মধ্যেই আজ দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অতীতে সংঘটিত গুমের প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দায়ীদের বিচারের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে গুমের অভিযোগ না ওঠাকে বড় স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

গুম কমিশনের প্রতিবেদনে ভয়াবহ চিত্র

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুমের অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুমের অভিযোগ খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় কমিশনকে।

গত জানুয়ারিতে সরকারের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, তারা মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ পেয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে এমন মামলা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে।

কমিশনের সদস্যদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। তাদের মতে, ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। দীর্ঘদিনের ভয়, সামাজিক চাপ ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেননি। ফলে নথিভুক্ত সংখ্যার বাইরে আরও অনেক ঘটনা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‘আয়নাঘর’—গোপন বন্দিশালার ভয়াবহতা

বাংলাদেশে গুমের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর একটি ‘আয়নাঘর’। ২০২৪ সালের পর একাধিক ব্যক্তি প্রকাশ্যে এসে গোপন আটককেন্দ্রে দীর্ঘদিন বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা, একাকী বন্দিত্ব, জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের নানা অভিযোগ।

গুমের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিশনও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক গোপন আটককেন্দ্রের তথ্য সামনে আনে এবং বেশ কয়েকটি স্থাপনা পরিদর্শন করে।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সদর দপ্তরের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলসহ র‍্যাব, ডিবি ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন সংস্থার অন্তত আটটির বেশি গোপন বন্দিশালার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। ডিজিএফআই সদর দপ্তরের একটি ইন্টারোগেশন সেলও পরিদর্শন করে কমিশন। সেখানে অন্তত ২২টি সেল থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্য, শুধু অভিযোগের তালিকা তৈরি করলেই তাদের অপেক্ষার অবসান হবে না। প্রয়োজন প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, প্রমাণ সংরক্ষণ, দায়ীদের বিচার এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, গোপন আটককেন্দ্রগুলোর তথ্য প্রকাশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে।

‘গুমের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দেওয়া যাবে না’

মানবাধিকারকর্মী ও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য মো. নূর খান লিটনের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে দীর্ঘদিন গুমের ঘটনা আড়াল করা হয়েছে। তাই গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেওয়া হলে তা কতটা কার্যকর ও নিরপেক্ষ হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও সাহসী ব্যক্তিদের নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের আরেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গুমের অভিযোগ পুলিশের কাছে দেওয়া এবং পুলিশকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার মধ্যে মৌলিক সমস্যা রয়েছে। কমিশনের কাছে পাওয়া দেড় হাজারের বেশি অভিযোগের মধ্যে প্রায় ২৫০টি ঘটনায় অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে আগে পুলিশ জিডি বা অভিযোগ গ্রহণ না করায় তদন্ত এগোয়নি বলেও জানান তিনি।

কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। কারও মৃত্যু হলে পরিবার অন্তত তার মরদেহ পায়, শেষকৃত্য করতে পারে এবং শোকের একটি পরিণতি তৈরি হয়। কিন্তু গুমের ঘটনায় পরিবার জানতেই পারে না প্রিয়জন কোথায়, তিনি জীবিত নাকি মৃত।

তার মতে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘদিন আশা ও হতাশার মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত অবস্থায় জীবন কাটায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক সংকট ও নানা ধরনের চাপ।

‘আমার স্বামী কোথায়, কেমন আছে—এটুকু জানতে চাই’

চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা এলাকা থেকে ২০১২ সালের ২৪ আগস্ট গুম হন মোহাম্মদ ফিরোজ খান পিন্টু—এমন অভিযোগ তার স্ত্রী আমেনা আক্তার মিষ্টির।

স্বামীকে হারানোর সময় তাদের সন্তান ছিল মাত্র দুই বছরের। সেই সন্তানকে নিয়ে স্বামীর সন্ধানের আশায় কেটে গেছে ১৪ বছর। ২৪ আগস্ট ১৫ বছরে পা দিয়েছেন মিষ্টি। কিন্তু এত বছর পরও তার একটাই প্রশ্ন—স্বামী ও দেবর কোথায়? তাদের সঙ্গে কী করা হয়েছে?

স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পরের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিষ্টি। তিনি জানান, প্রথমে দুই বছর শাশুড়ির সঙ্গে ছিলেন। পরে সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যেতে হয়। স্বামী গুম হওয়ার কারণে বাসা ভাড়াও পাওয়া যেত না। তার পরিবারকে এমনভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল যেন স্বামী কোনো অপরাধী ছিলেন এবং সরকার তাকে নিয়ে গেছে।

মিষ্টি বলেন, তার শাশুড়ির দুই সন্তানই গুম হয়েছেন। বৃদ্ধ এই নারী এখন স্বামী ও সন্তান—দুই-ই হারিয়েছেন। তার ওষুধ ও খাবারের জন্য কেন তাকে অন্যের কাছে হাত পাততে হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

২০২০ সাল থেকে সাহস করে স্বামীর সন্ধানে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন মিষ্টি। কিন্তু ১৫ বছর পরও তাকে স্বামীর সন্ধান চেয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “কেন এখনো আমরা কষ্ট করব? আমার স্বামী কোথায় আছে, কেমন আছে—এটুকু জানতে চাই।”

তার দাবি, গুমের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা হোক এবং তার স্বামী ও দেবরকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তার মতো আর কোনো স্ত্রীকে যেন স্বামীর সন্ধানে বছরের পর বছর কাঁদতে না হয়—এটাই তার আকুতি।

স্বামীকে খুঁজতে গিয়ে গ্রেপ্তার, নির্যাতন—মুক্তার অভিযোগ

বাগেরহাটের মোংলা এলাকা থেকে মিরাজ শেখকে চলতি বছরের ১০ এপ্রিল কোস্ট গার্ড সদস্যরা আটক করে নিয়ে যান—এমন অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী মুক্তা খাতুন। এরপর থেকে মিরাজের আর কোনো সন্ধান পাননি বলে দাবি তার পরিবারের।

মুক্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে মিরাজকে কোস্ট গার্ড সদস্যরা আটক করেন। তাকে মারধর করে জেটির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

স্বামীর সন্ধানে কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও কোনো তথ্য না পেয়ে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন মুক্তা। তার অভিযোগ, এরপর তিনি, তার শাশুড়ি ও ননদকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয় এবং ২৭ দিন কারাগারে থাকতে হয়।

মুক্তার অভিযোগ, স্বামীকে খুঁজতে গিয়ে তাকে ও পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। স্বামীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুক্তার আকুতি, “আমার স্বামীকে ফেরত দিয়ে দিক। আমার একটা ছেলে আছে, আমি ছেলে নিয়ে কোথায় যাব?”

২৩ দিন গুম, মুক্তির পর জেলগেট থেকেই ফের গুম

আব্দুল কাইয়ুম ‘ভয়েস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ার্ড পারসন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা। নিজেও গুমের শিকার হয়েছেন তিনি।

কাইয়ুমের দাবি, ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল সাদা পোশাকের একদল লোক তাকে রামপুরা থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে র‍্যাব-১১-তে নেওয়া হয়। সেখানে ২৩ দিন তাকে গোপনে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ তার।

তিনি জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজের বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করতে প্রায় ২০টি থানায় যেতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এক আত্মীয়ের সুপারিশে জিডি নেওয়া হলেও পরে ওই আত্মীয়কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে দাবি করেন কাইয়ুম।

২৩ দিন পর তাকে একটি মামলায় আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু চার মাস পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পরও তিনি কারাগারের বাইরে আসতে পারেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জেলগেট থেকেই তাকে আবার তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

কাইয়ুম বলেন, গুমের সময় এমন কোনো নির্যাতন নেই যা তার ওপর করা হয়নি। প্রতিদিনই তার মনে হতো হয়তো সেদিনই তাকে হত্যা করা হবে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি পরিবারের নারী সদস্যদের নিয়ে হুমকি ও অশালীন বক্তব্যের মাধ্যমে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‘গুমের প্রমাণ ভুক্তভোগী কীভাবে দেবেন?’

গুমের শিকার সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান আইনটির কয়েকটি বিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তার বক্তব্য, গুম এমনভাবে করা হয় যাতে কোনো আলামত না থাকে। অথচ ভুক্তভোগী সব প্রমাণ করতে না পারলে শাস্তির বিধান রাখা হলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, তিনি নিজেও দুবার গুমের শিকার হয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার কারা তাকে গুম করেছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি। তার প্রশ্ন—যদি ভুক্তভোগী নিজেই না জানেন তাকে কোন সংস্থা তুলে নিয়ে গেছে, তাহলে প্রমাণের দায় তার ওপর কীভাবে বর্তাবে?

আইন সংশোধনের দাবি

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

ইলিয়াস আলী ও সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের ঘটনাসহ তিনটি ঘটনার আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো ঘটনায় কে একজন ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে গেছে, সেটিই যদি তদন্তে নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে ভুক্তভোগীর ওপর প্রমাণের পুরো দায় চাপানো যৌক্তিক নয়।

তার মতে, আইনটি আরও স্পষ্ট, সর্বজনীন ও অপব্যবহারমুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, গুম কমিশন ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশনকে আরও অর্থায়ন, স্বাধীনতা ও ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বর্তমান আইনি কাঠামোতে এসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, একজন গুমের শিকার ব্যক্তি হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে এমন বাংলাদেশ দেখতে চান না, যেখানে মতপ্রকাশের সময় মানুষকে ভাবতে হবে—“আমাদের গুম করা হবে কি না।”

সরকারের বক্তব্য

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেওয়া বাণীতে বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে।

তিনি গুমকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব গুম হওয়া ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জানান।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক অধিকার ও ভিন্নমত দমনে গুম-অপহরণের পথ বেছে নিয়েছিল এবং দীর্ঘদিন মানুষকে আটকে রাখার জন্য গোপন বন্দিশালা তৈরি করেছিল, যা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পায়।

তিনি জানান, দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে ওই সময়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে গুম বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য—‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’। প্রধানমন্ত্রী গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাপী ঐক্য ও সংহতির আহ্বান জানিয়েছেন।

নতুন আইনে তদন্তের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন করে। পরে কিছু পরিবর্তন এনে ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করা হয়।

উত্থাপিত বিলের ১৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে সেই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। সরকার অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো বাহিনী অথবা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার দিতে পারবে।

তবে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ও গুমের ভুক্তভোগীরা বলছেন, শুধু বাহিনী পরিবর্তন করে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়াই যথেষ্ট নয়। তাদের দাবি, তদন্তের দায়িত্ব এমন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দিতে হবে, যার ওপর কোনো বাহিনীর প্রভাব থাকবে না।

অধিকারের এক আলোচনা সভায় গুমফেরত ব্যক্তি ও নিখোঁজদের স্বজনেরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অনেকেই প্রিয়জনের সন্ধান চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেখানে গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর বর্তমান কাঠামো পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আইন প্রণয়নের দাবি জানান।

অপেক্ষার শেষ কোথায়?

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস প্রতি বছর ফিরে আসে। কিন্তু নিখোঁজ স্বজনদের কাছে দিনটি কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়—এটি দীর্ঘ অপেক্ষা, অজানা আতঙ্ক আর অসমাপ্ত প্রশ্নের দিন।

কারও কাছে ১৪ বছর, কারও কাছে কয়েক মাস, আবার কারও কাছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই প্রশ্ন—“আমার প্রিয় মানুষটি কোথায়?”

এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তাদের অপেক্ষারও শেষ নেই। তাই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি একটাই—তালিকা নয়, সত্য জানতে চান তারা; আশ্বাস নয়, চান প্রিয়জনের সন্ধান; আর অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের চান আইনের আওতায় এনে বিচার।