অসুস্থ হলে শুধু বিশ্রাম নেয় না আফ্রিকান হাতি। নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য তারা নির্দিষ্ট কিছু ঔষধি গাছও বেছে নেয় বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। কেনিয়ার মাউন্ট এলগন এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় স্থানীয় বাসিন্দা, বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষক ও প্রবীণদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে হাতিদের এমন আচরণের তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের দাবি, অসুস্থতা বা শারীরিক সমস্যার সময় হাতিরা নির্দিষ্ট উদ্ভিদ খুঁজে বের করে সেগুলোর বিভিন্ন অংশ খেতে পারে। গবেষণাটি ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
মাউন্ট এলগনের হাতিদের বিশেষ আচরণ
মাউন্ট এলগনের হাতিদের নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। পাহাড়ি গুহায় ঢুকে দাঁত দিয়ে পাথর ঘষে প্রয়োজনীয় খনিজ সংগ্রহ করার কারণে এ অঞ্চলের হাতিরা ‘লবণ-খননকারী হাতি’ হিসেবেও পরিচিত।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, খনিজ সংগ্রহের পাশাপাশি বনাঞ্চলের কিছু উদ্ভিদও হাতিরা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করে।
শাবকদেরও ঔষধি গাছ খাওয়ায় মা হাতি
সংরক্ষণবিষয়ক প্রতিষ্ঠান মাউন্ট এলগন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় গবেষকেরা স্থানীয় বাসিন্দা ও বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে হাতিদের আচরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন।
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে, কোনো হাতি অসুস্থ বোধ করলে নির্দিষ্ট কিছু গাছ বেছে নিতে পারে। এমনকি মা হাতিদের শাবকদেরও উদ্ভিদের ঔষধি অংশ খাওয়াতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা।
সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ৩৫ প্রজাতির উদ্ভিদের একটি তালিকা তৈরি করেছেন, যেগুলো হাতিরা বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে অন্তত ২৫টি উদ্ভিদের ঔষধি ব্যবহারের তথ্য স্থানীয় মানুষের মধ্যে আগে থেকেই প্রচলিত ছিল।
একজন বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষক জানান, তিনি মা হাতিদের ‘অঙ্গুরউইট’ নামে পরিচিত একটি উদ্ভিদ শাবকদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করতে দেখেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মা হাতিরা পাতাগুলো সরিয়ে ওই উদ্ভিদের অংশ অন্য কিছু গাছের শিকড়ের সঙ্গে চিবিয়ে নেয়। পরে সেই উদ্ভিদজাত উপাদান শাবকদের খেতে দেয়।
তবে হাতিরা নির্দিষ্ট রোগ বা শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা বুঝে এসব উদ্ভিদ বেছে নেয় কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্যামেরায় ধারণ করা হবে হাতিদের আচরণ
গবেষকেরা এখন আরও তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন। স্থানীয় বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে, যাতে হাতিদের উদ্ভিদ নির্বাচন ও ব্যবহারের আচরণ সরাসরি ধারণ করা যায়।
গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হলো, হাতিরা যেসব উদ্ভিদ ব্যবহার করে সেগুলোর মধ্যে ভবিষ্যতে নতুন কোনো ঔষধি উপাদান আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখা।
গবেষক ড. ফাবিয়েন শুলৎজের মতে, স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছে। এখন হাতিদের অনুসরণ করে দেখা হবে, নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যার সময় তারা নিয়মিত কোনো নির্দিষ্ট উদ্ভিদ বেছে নেয় কি না এবং এসব উদ্ভিদের আদৌ কোনো জৈবিক কার্যকারিতা রয়েছে কি না।
প্রাণীদের স্ব-চিকিৎসা নতুন নয়
প্রাণীরা নিজেদের চিকিৎসায় প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে—এমন তথ্য অবশ্য নতুন নয়। বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে অসুস্থতা মোকাবিলার উদাহরণ পাওয়া গেছে।
হাতির স্ব-চিকিৎসা নিয়ে প্রাচীনতম বৈজ্ঞানিক বর্ণনাগুলোর একটি পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের শুরুতে। রোমান লেখক ক্লডিয়াস এলিয়ান তাঁর ‘দে ন্যাচুরা এনিমালিয়াম’ গ্রন্থে এমন একটি হাতির কথা উল্লেখ করেন, যে বর্শা ও তীরের আঘাতে আহত হওয়ার পর জলপাই গাছের ফুল ও তেল খেয়েছিল এবং পরে সুস্থ হয়ে ওঠে।
আধুনিক গবেষণাতেও মশা, ড্রোসোফিলা, মৌমাছি এবং বিভিন্ন প্রজাতির গ্রেট এপের মধ্যে স্ব-চিকিৎসার আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
হাতির আচরণের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে বন সংরক্ষণ
গবেষকদের মতে, হাতির চিকিৎসায় ব্যবহৃত উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা শুধু প্রাণীদের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; ভবিষ্যতে নতুন ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও এটি সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
গবেষক ড. এলোডি ফ্রেইম্যানের মতে, মানুষের ব্যবহৃত অনেক ওষুধের পেছনেও উদ্ভিদ, শৈবাল, ছত্রাক ও প্রবালপ্রাচীর থেকে পাওয়া বিভিন্ন যৌগের ভূমিকা রয়েছে।
তাই গবেষকদের মতে, বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা জরুরি। কারণ এসব পরিবেশে থাকা উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীবের মধ্যেই ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি উপাদান লুকিয়ে থাকতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা



