দেশের অর্থনীতি বর্তমানে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। রাজস্ব আয় কমছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মন্থর, আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া চলতি বছরেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচিত সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগ বাড়ানো।
শনিবার ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানানো হয়। ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫–২৬: নির্বাচনি বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক ব্রিফিংয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়াই বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কমে, বেকারত্ব বাড়ে এবং অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পেছনেও কর্মসংস্থানের সংকট বড় ভূমিকা রেখেছে। তাই অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনশক্তিকে কাজে লাগাতে শক্তিশালী ও আস্থাশীল ব্যাংকিং খাতের বিকল্প নেই। এজন্য ব্যাংক খাত সংস্কারে স্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। প্রয়োজনে দুর্বল ব্যাংক একীভূত বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, এডিপি বাস্তবায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগের বর্তমান নিম্নহার গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিদেশি বিনিয়োগও সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। রাজস্ব বাড়াতে নতুন পথ খুঁজতে হবে, করদাতাদের উৎসাহিত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় করছাড় বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থ পাচার রোধ, করব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রকল্প ব্যয়ের ওপর কঠোর নজরদারি জরুরি।
তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশে তা প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিশেষ করে চালের ক্ষেত্রে উৎপাদন বেশি হলেও দাম কমছে না। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা বড়। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; খাদ্য সরবরাহ ও মজুতব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, বিদেশি বিনিয়োগের স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট ও বৈদেশিক খাতের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ও সাহসী সংস্কার কর্মসূচি এখন অপরিহার্য। সরকারি অর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো, নীতি ধারাবাহিকতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর মূল শর্ত।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি এখন কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে। খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা সংস্কার, মজুতদারি বন্ধ, পরিবহণ ও সংরক্ষণ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ এবং সময়মতো খাদ্য আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ব্যাংক খাত সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। খেলাপি ঋণ কমাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা, ব্যাংক কোম্পানি আইন বাস্তবায়ন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি কর ও ভ্যাটব্যবস্থা সহজ করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং প্রবাসী আয় ধরে রাখার কৌশল গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী নির্বাচন যেন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সহিংসতামুক্ত হয়—এটাই প্রত্যাশা। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নীতি ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে এবং জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপিত হবে।



