পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও তীব্র স্রোতের কারণে ফরিদপুরের সদরপুর অংশে নদীভাঙন থামছে না। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। একই সঙ্গে নদীপাড়ে গড়ে ওঠা প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন পিঁয়াজখালী হাট, ঘাট, আশ্রয়ণ প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী ঘাট, চেয়ারম্যান ঘাট ও মুন্সীরচর এবং পার্শ্ববর্তী চরনাসিরপুর ইউনিয়নের বাবুরালি মোল্যার কান্দি, শিমুলতলী, নাজির শিকদার কান্দি, মনিরদ্দিন ফকির কান্দি, কাজিকান্দি ও শিকদার কান্দিসহ বিস্তীর্ণ এলাকার নদীতীর একযোগে ভাঙছে। তীব্র স্রোতে মাটি ধসে পড়ছে নদীতে।
ভাঙনের আশঙ্কায় নদীপাড়ের অনেক বাসিন্দা ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়েছেন। তবে রক্ষা করা যাচ্ছে না ফসলি জমি। ভাঙনের মুখে পড়া কৃষকেরা আধাপাকা ধানসহ বিভিন্ন ফসল কেটে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে নিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে চরনাসিরপুর ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভবন, ঢেউখালীর শতবর্ষী পিঁয়াজখালী হাট, জনসংঘ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়, চরনাসিরপুর উচ্চবিদ্যালয়, কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, ছোট-বড় বাজার ও জনবসতিও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এতে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের দাবি, সদরপুর অংশে পদ্মা নদীতে এর আগে এমন তীব্র স্রোত দেখা যায়নি। তাদের ভাষ্য, বাগড়া ঘাট থেকে দিয়ারা ও চরনাসিরপুর-ঝাউকান্দা হয়ে পদ্মা নদী শাসনের কাজের মাত্র ১৭ কিলোমিটার সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পের কাজ স্থগিত রয়েছে। এতে নদীর মূল প্রবাহ সদরপুরের দিকে ঘুরে এসে ভাঙন তীব্র হয়েছে বলে তাদের ধারণা।
শয়তানখালী ঘাটের ইজারাদার মানিক বেপারি বলেন, ‘যে হারে নদী ভাঙছে, তাতে আগামী বছর পিঁয়াজখালী হাট বলে কিছু থাকবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন বলেন, ‘শুনেছি উজানে নদী শাসনের কাজ বন্ধ রয়েছে এবং সেখানে বিশাল বালুর স্তূপ জমেছে। এর ফলে নদীর স্রোতের গতিপথও পরিবর্তিত হতে পারে।’
জনসংঘ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আইয়ুব আলী বলেন, ‘নদীর ভাঙন অত্যন্ত তীব্র। প্রতিদিনই ভাঙন বাড়ছে। আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। কখনো ভাবিনি এত অল্প সময়ের মধ্যে নদী আমাদের এতটা কাছে চলে আসবে।’
নদীভাঙনের মুখে পড়া চরনাসিরপুরের কৃষক জয়নাল আধাপাকা ধান কাটতে কাটতে বলেন, ‘আর কিছুদিন সময় পেলে ধান ঘরে তুলতে পারতাম। এখন বাধ্য হয়ে তা গরুর খাদ্য হিসেবে কেটে নিয়ে যাচ্ছি।’
চরনাসিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. রোকন উদ্দিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভবনটিও চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত স্থায়ী সমাধান করা না হলে ইউনিয়নের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
ঢেউখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বয়াতি বলেন, ‘আমার জীবনে এত তীব্র নদীভাঙন দেখিনি। চোখের সামনে মাত্র ২০ মিনিটে প্রায় ৫০০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট প্রস্থের একটি এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। কয়েক বছর আগেও এমন পরিস্থিতি ছিল না। ভাঙনের গতি ভয়াবহ। তাই দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ বা নদী শাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, ‘এ এলাকার মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি সরকার অবগত রয়েছে। পদ্মা নদী শাসনের বিষয়টি প্রকল্প আকারে একনেকে (ECNEC) তোলা হয়েছে এবং বর্তমানে তা পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে কাজ করছেন। আশা করি, খুব শিগগিরই একটি স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে।’
স্থানীয়দের দাবি, নদীভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সদরপুরের বিস্তীর্ণ জনপদ, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো আরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।



