tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়ডিসেম্বরকে টার্গেট করে অস্থিতিশীলতার ছক, বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল...

ডিসেম্বরকে টার্গেট করে অস্থিতিশীলতার ছক, বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল ক্যাডার

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও নাশকতার চেষ্টা সেই পরিকল্পনারই অংশ ছিল বলে দাবি করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় আপাতত সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

পোশাকশ্রমিকদের স্বাভাবিক দাবিদাওয়াকে পুঁজি করে পুরো তৈরি পোশাক খাত অস্থিতিশীল করার একটি সুপরিকল্পিত ছকের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীর মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা ছড়ানোর এই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক সামনে এসেছে গত ৩ নভেম্বর কালশী-পূরবী মোড়ে ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানার সামনে ডিএমপির কনস্টেবল সালমানের ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার ১৯ জনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।

ডিবির দাবি, ওই সহিংসতা নিছক শ্রমিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। এর পেছনে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা এবং সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপিসহ একটি প্রভাবশালী চক্রের ইন্ধন ও অর্থায়নের তথ্য পাওয়া গেছে। সিসিটিভি ফুটেজ এবং আসামিদের ব্যবহৃত ১৬টি হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপের অডিও বার্তা ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন ঢাকায় এনে সহিংসতায় যুক্ত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্য দিয়ে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে সংকটে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

কারখানার নিয়ন্ত্রণে পাঁচ সদস্যের সিন্ডিকেট

ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, কালশীর ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানাটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচির মালিকানায় ছিল। পরে কাগজে-কলমে তিনি সরে দাঁড়ালেও কারখানাটির নিয়ন্ত্রণ পাঁচ সদস্যের একটি সিন্ডিকেটের হাতে চলে যায় বলে তদন্তে দাবি করা হয়েছে।

ওই সিন্ডিকেটে রয়েছেন সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও আবু হাসান মুহম্মদ তারিক। অন্য সদস্যরা হলেন আতিকুল ইসলামের শ্যালক নুরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও মুশতাক আহমেদ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা কচি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, তাঁর ভাগিনা আলিফ মোল্লা, সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক আক্তার রনি এবং ওই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলরসহ বেশ কয়েকজন আন্দোলনে অর্থায়ন ও নেপথ্যে ইন্ধন জুগিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

তাঁর ভাষ্য, শ্রমিকদের আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুরো তৈরি পোশাক খাত অস্থিতিশীল করার সুপরিকল্পিত ছক ছিল এটি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সহিংসতার নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

১৬টি গোপন গ্রুপে পরিকল্পনা ও যোগাযোগ

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আসামিদের মোবাইল ফোন জব্দ করে অন্তত ১৬টি হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। ‘চেতনা মুক্তিযুদ্ধ’, ‘শেখ হাসিনা রিজার্ভ ফোর্স’, ‘ঢাকা জেলা গেরিলা ৭১’, ‘হাসু আপার বাংলা’, ‘শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন’ ও ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ গেরিলা’সহ বিভিন্ন নামে এসব গ্রুপ পরিচালিত হতো বলে দাবি তদন্তকারীদের।

তাঁদের অভিযোগ, এসব গ্রুপে ছদ্মনামে যোগাযোগ করে সহিংসতা ও নাশকতার পরিকল্পনা আদান-প্রদান করা হতো। আলামত মুছে ফেলার জন্য বেশ কিছু বার্তা মুছে ফেলা হলেও ডিবির ফরেনসিক দল অডিও ও ছবি উদ্ধার করেছে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, মিছিলে অংশ নেওয়া কিংবা গাড়িতে আগুন দেওয়ার ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলে সেসব ছবি দেখে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগিনা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লা—এমন অভিযোগ রয়েছে। গত ১ নভেম্বর পল্লবীতে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ভিডিও ধারণ করে শীর্ষ নেতাদের কাছে পাঠান কক্সবাজারের যুবলীগ নেতা মুয়াজ্জেম শাহরিয়ার নেওয়াজ বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

বিভিন্ন জেলা থেকে লোক এনে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ

তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, পোশাকশ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে পঞ্চগড়, কক্সবাজার ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে পঞ্চগড় কলেজ ছাত্রলীগের নেতা নাহিদ হাসানের নামও এসেছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার রনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজীপুরে দুই পোশাকশ্রমিকের লাশ পাওয়ার খবর প্রচার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিবির দাবি, খবরটি ছিল ভিত্তিহীন। এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে তাঁদের রাজপথে নামানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

কনস্টেবল সালমানের ওপর হামলায় গ্রেপ্তার আট

গত ৩ নভেম্বর কালশী মোড়ে ডিএমপির কনস্টেবল সালমানকে ঘিরে ধরে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় বিভিন্ন স্থানের চার-পাঁচটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আশিক জুলহাস, আরাফাত ইসলাম জিসান, মো. রশিদ আলী, সোহেল রানা, মিলন বাবু, আনারুল ইসলাম, মো. রানা ও মনছুর আলী। এর আগে ১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ডিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লার সরাসরি যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থ লেনদেনের একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অডিও বার্তায় নির্দেশনা দিয়ে লোক জড়ো করার তথ্য

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভয়েস মেসেজভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহার করতেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আসা অডিও বার্তায় দূর থেকে ফোনে নির্দেশনা দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে লোকজনকে জড়ো করার তথ্য পাওয়া গেছে।

এমন একটি অডিও বার্তায় গ্রেপ্তার নাহিদকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা সবাই ১২ নম্বর ইলিয়াস মোল্লার মার্কেটের সামনে আসেন… এখানে পুলিশ একদিকে চলে গেছে, আমাদের সুযোগ নিতে হবে… আজকের দিনটা করতে পারলে আমাদের নাম হবে।’

ডিবির দাবি, উদ্ধার করা ডিজিটাল আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য থেকে সহিংসতার পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

তবে তদন্তে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।