v
ইসরাইলের আগামী ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারও সরকার গঠন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। নির্বাচনের পর পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং নতুন জোট গঠনের সমীকরণই নির্ধারণ করবে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট ১২০টি আসনে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ওই হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরাইল। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইসরাইলি হামলার কারণে আঞ্চলিক সংঘাতও বিস্তৃত হয়।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে আসনসংখ্যার ব্যবধান খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। তবে নির্বাচনে কোনো পক্ষ এগিয়ে থাকলেই যে তারা সরকার গঠন করতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ইসরাইলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলকে জোটবদ্ধ হতে হয়। দেশটির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো দল এককভাবে নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন।
জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী মিত্রদের নিয়ে গঠিত শিবিরের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫০। ফলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলোসহ ছোট দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনের পর সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি আটটি ভিন্ন পথে এগোতে পারে।
১. পুরোনো মিত্রদের নিয়ে আবারও সরকার গঠন নেতানিয়াহুর
জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকলেও রাজনৈতিক মিত্রদের সমর্থন ধরে রাখতে পারলে আবারও সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন নেতানিয়াহু। নিজের লিকুদ পার্টির নেতৃত্বে পুরোনো জোট অক্ষুণ্ন রাখা কিংবা নতুন অংশীদার যুক্ত করার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন তিনি।
তাঁর পরিচিত মিত্রদের মধ্যে রয়েছেন কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টি এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টি।
এ ছাড়া অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের প্রতিনিধিত্বকারী শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম পার্টির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অতীতে দল দুটি একাধিকবার নেতানিয়াহুর সরকারে যোগ দিলেও বিভিন্ন সময়ে জোট ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে তারা জোট ত্যাগ করে।
নির্বাচনের পর এসব দলের সমর্থন পুনরায় নিশ্চিত করতে পারলে নেতানিয়াহুর পক্ষে ক্ষমতায় ফেরার পথ তৈরি হতে পারে।
২. বিরোধী জোটের নেতৃত্বে নতুন সরকার
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্য নিয়ে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চারটি বিরোধী দল পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান এড়িয়ে চলার বিষয়ে সমঝোতা করে। দলগুলো হলো ইয়াশার পার্টি, দ্য ডেমোক্র্যাটস, ইসরাইল বেইতেনু পার্টি এবং টুগেদার জোট।
ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করার লক্ষ্য সামনে রেখে তারা একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে সরকার গঠন করতে পারলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সে বিষয়ে বিরোধী শিবির এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও এ পদের একজন সম্ভাব্য দাবিদার। তিনি ইয়ার লাপিদের সঙ্গে টুগেদার জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলো পর্যাপ্ত আসন ও পারস্পরিক সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলে নেতানিয়াহুর বিকল্প সরকার গঠিত হতে পারে।
৩. রা’আমের সমর্থনে জোট সরকার
ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর মধ্যে রয়েছে আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। জনমত জরিপে দল দুটির সম্মিলিত আসনসংখ্যা প্রায় ১৩ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
রা’আমের পূর্ণ নাম ইউনাইটেড আরব লিস্ট। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে যোগ দিয়ে দলটি ইসরাইলের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেয়। দেশটির সরকারে অংশ নেওয়া প্রথম আরব নেতৃত্বাধীন দল ছিল এটি।
দলটির নেতা মনসুর আব্বাস ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিরোধী শিবিরের সরকার গঠনের জন্য অতিরিক্ত সমর্থন প্রয়োজন হলে রা’আম আবারও সমঝোতায় যেতে পারে।
ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের মধ্যে বাড়তে থাকা সহিংস অপরাধ মোকাবিলা এবং আবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন আব্বাস।
তবে বিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতা এ ধরনের সমঝোতার পক্ষে নন। এমনকি গাদি আইজেনকোটও রা’আমকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। ফলে দলটির সমর্থন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্বাচনের পরের আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।
৪. বাইরের সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার
কোনো রাজনৈতিক শিবির নেসেটের ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলে অন্য দলের বাহ্যিক সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থায় সমর্থন দেওয়া দলগুলো সরাসরি মন্ত্রিসভায় যোগ না দিয়েও আস্থাভোটসহ গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে পারে।
জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সরকার গঠনের উদ্যোগ নিলে তারা আস্থাভোটে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে একধরনের সুরক্ষা দিতে পারে।
এর বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি এবং সংগঠিত অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার শর্ত সামনে আসতে পারে।
তবে এ ধরনের সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। সমর্থন দেওয়া দলগুলো অবস্থান পরিবর্তন করলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে সরকার সহজেই সংকটে পড়তে পারে।
৫. প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর অংশগ্রহণে জাতীয় ঐক্যের সরকার
রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে নেতানিয়াহুর শিবির ও বিরোধী দলগুলোর একাংশ নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্যের সরকার বলতে এমন একটি বৃহত্তর জোটকে বোঝানো হয়, যেখানে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে সরকার পরিচালনায় অংশ নেয়। সাধারণত যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মতো পরিস্থিতিতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০২০ সালের মে মাসে টানা তিনটি নির্বাচনের পরও সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হলে নেতানিয়াহু ও বেনি গান্তজ ঐক্যের সরকার গঠন করেছিলেন। তবে এক বছরের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে যায়।
এরপর ২০২৩ সালে হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর গান্তজ ও তাঁর দলের সদস্যরা আবারও নেতানিয়াহুর জোটে যোগ দেন। আগে বিরোধিতা করলেও জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁরা একসঙ্গে সরকার পরিচালনায় অংশ নিয়েছিলেন।
নতুন নির্বাচনের পর কোনো পক্ষ স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে একই ধরনের সমঝোতার আলোচনা সামনে আসতে পারে।
৬. পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের চুক্তি
নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জটিলতা দূর করতে দুই রাজনৈতিক নেতা নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে চুক্তি করতে পারেন।
২০২০ সালে নেতানিয়াহু ও বেনি গান্তজ এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে নেতানিয়াহুর পর গান্তজের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জোট ভেঙে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদও একই ধরনের চুক্তি করেন। সমঝোতা অনুযায়ী, বেনেটের পর লাপিদের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২২ সালের জুনে বেনেটের জোট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। পরের মাসে লাপিদ তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এবারও কোনো একটি দল বা জোট এককভাবে স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে না পারলে পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব আলোচনায় আসতে পারে।
৭. নেতানিয়াহুর শিবির বা বিরোধী জোট থেকে বিকল্প প্রধানমন্ত্রী
নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের যেকোনো একটির ভেতর থেকে বিকল্প নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসরাইলের ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নেসেটের সদস্যদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো শিবিরের নেতা অন্য অংশীদারদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে একই শিবিরের অন্য কোনো নেতাকে সামনে আনা হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক মিত্ররা তাঁর পরিবর্তে অন্য কাউকে সমর্থন করতে পারেন। একইভাবে বিরোধী জোটের মধ্যেও নেতৃত্ব নিয়ে সমঝোতার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
অর্থাৎ, নির্বাচনে কোন শিবির কতটি আসন পেল, তার পাশাপাশি জোটের অংশীদারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা ও সমঝোতাও শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
৮. সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে আবারও নির্বাচন
নির্বাচনের পর কোনো নেতা প্রয়োজনীয় সংসদীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ইসরাইলকে আবারও সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শিবিরগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব এবং স্থিতিশীল সরকার গঠনে ব্যর্থতার কারণে বারবার ভোটের আয়োজন করতে হয়।
এবারও কোনো পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের ফলাফল ইসরাইলের পরবর্তী সরকার গঠনের প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরলেও চূড়ান্ত সমীকরণ নির্ভর করবে জোটের আলোচনা, ছোট দলগুলোর অবস্থান এবং নেসেটের সদস্যদের সমর্থনের ওপর। ফলে ভোটের পরও দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।



