ইসলামের ইতিহাসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দোয়া কবুল হওয়ার বহু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সাহাবিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, কখনো অনাবৃষ্টির সময় বৃষ্টির জন্য তাঁর প্রার্থনা, কখনো কারও সম্পদ ও সন্তানের কল্যাণ কামনা, আবার কখনো প্রিয়জনের হেদায়েত চেয়ে করা দোয়া আল্লাহর রহমতে পূর্ণতা পেয়েছে। এমনই তিনটি ঘটনা তুলে ধরা হলো।
১. দোয়ার পর বৃষ্টি, পরে মদিনা থেকে সরে গেল মেঘ
একদিন মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন মহানবী (সা.)। এ সময় এক সাহাবি এসে মদিনার অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষের কথা জানালেন। পানির অভাবে গবাদিপশু মারা যাচ্ছিল, কূপগুলোও শুকিয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানান।
সাহাবির কথা শুনে নবীজি (সা.) খুতবা থামিয়ে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করেন। তাঁর দোয়া ছিল—‘আল্লাহুম্মা-সকিনা’, অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আমাদের বৃষ্টি দান করুন।
এরপরই মদিনায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। বর্ণনা অনুযায়ী, টানা সাত দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল। পরের শুক্রবার মহানবী (সা.) যখন আবার খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন সেই সাহাবি এসে জানান, অতিবৃষ্টিতে মদিনায় বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, গবাদিপশুও বিপাকে পড়ছে। এবার তিনি বৃষ্টি থামানোর জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানান।
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, মদিনার ওপর থেকে বৃষ্টি সরিয়ে আশপাশের অঞ্চলে বর্ষণ করার জন্য। বর্ণনায় বলা হয়েছে, তাঁর দোয়ার পর মদিনার আকাশ থেকে মেঘ সরে যায়। শহরের আকাশ পরিষ্কার হয়ে সূর্য দেখা দেয়, অথচ আশপাশের এলাকাগুলোতে বৃষ্টি চলতে থাকে।
২. হজরত আনাস (রা.)-এর সম্পদ ও সন্তানের জন্য দোয়া
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর একজন ঘনিষ্ঠ সাহাবি। তাঁর মা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ছেলের জন্য দোয়া করার আবেদন জানিয়েছিলেন। জবাবে নবীজি (সা.) আল্লাহর কাছে আনাসের সম্পদ ও সন্তানের মধ্যে বরকত কামনা করেন।
বর্ণিত আছে, এই দোয়ার বরকতে হজরত আনাস (রা.)-এর জীবনে প্রাচুর্য এসেছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, মদিনার অন্যদের খেজুরবাগানে বছরে একবার ফলন হলেও তাঁর বাগানে বছরে দুইবার খেজুর হতো।
তাঁর সন্তানসংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রচলিত এই ঘটনা মুসলিমদের কাছে আল্লাহর কাছে কল্যাণ ও বরকত প্রার্থনার একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
৩. আবু হুরায়রা (রা.)-এর মায়ের ইসলাম গ্রহণ
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর মায়ের হেদায়েত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। তাঁর মা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। মায়ের মুখে মহানবী (সা.)-এর প্রতি কটু কথা শুনে তিনি কষ্ট পেতেন। তাই একদিন তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে মায়ের জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানান।
নবীজি (সা.) তখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, তিনি যেন আবু হুরায়রা (রা.)-এর মাকে হেদায়েত দান করেন।
দোয়া শুনে আবু হুরায়রা (রা.) বাড়ির দিকে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে দেখেন, ঘরের দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে তাঁর মা অপেক্ষা করতে বলেন। কিছুক্ষণ পর গোসল করে পরিষ্কার পোশাক পরিধান করে তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন। এরপর তিনি ইসলামের সাক্ষ্যবাণী পাঠ করেন—‘আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।’ অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
মায়ের মুখে কালেমা শুনে আবু হুরায়রা (রা.) আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর কাছে ফিরে গিয়ে ঘটনাটি জানান। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ার বরকতে তাঁর বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
সিরাত ও হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় মহানবী (সা.)-এর দোয়া এবং সাহাবিদের জীবনে তার প্রভাবের নানা ঘটনা উঠে এসেছে। মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এসব ঘটনা আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, রহমত এবং তাঁর নবীর মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।



