জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার বাসভাড়া সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু করে পরিবহণগুলো। সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই ভাড়ানৈরাজ্য মঙ্গলবারও অব্যাহত ছিল। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে ৫ থেকে ২০ টাকা এবং দূরপাল্লার বাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম মহানগরেও বিভিন্ন রুটে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
বাড়তি ভাড়া নেওয়াকে কেন্দ্র করে যাত্রী ও পরিবহণকর্মীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়েছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি হাতাহাতি পর্যন্ত গড়িয়েছে।
রোববার রাতে সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। নতুন দাম সোমবার থেকে কার্যকর হয়। তবে তখনো বাসের নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। এর মধ্যেই সোমবার সকাল থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার বাস, মিনিবাস ও লেগুনায় বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়।
মঙ্গলবার সকালেও রাজধানীর রায়সাহেব বাজার, গুলিস্তান, পল্টন ও শাহবাগ এলাকায় বিভিন্ন বাসে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে মঙ্গলবার বিকেলে সরকার দূরপাল্লা ও মহানগরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানায়।
সিদ্ধান্তের আগেই বাড়তি ভাড়া
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী ভোগান্তির চিত্র পাওয়া যায়।
মঙ্গলবার দুপুরে সায়েন্সল্যাব থেকে সাভার পরিবহণের একটি বাসে রায়সাহেব বাজারে আসেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। তিনি জানান, আগে এই পথে ২০ টাকা ভাড়া দিলেও মঙ্গলবার তাঁর কাছে ২৫ টাকা চাওয়া হয়েছে। বাড়তি ভাড়া নিয়ে বাসের স্টাফদের সঙ্গে তাঁর কিছুক্ষণ কথা-কাটাকাটিও হয়।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তই এখনো হয়নি। তার আগেই বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। এর চাপ পড়ছে আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের ওপর।’’
একইভাবে নতুনবাজার থেকে ভিক্টর পরিবহণের বাসে গুলিস্তানে আসা আফতাব আহমেদের কাছ থেকে ৩০ টাকার পরিবর্তে ৪০ টাকা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘‘কিছুদিন পরপর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে। আর এর চাপ এসে পড়ে আমাদের ওপর। ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলে নিয়ম মেনে বাড়ানো হোক। কিন্তু সিদ্ধান্তের আগেই বেশি টাকা নেওয়া ঠিক নয়।’’
সোমবার দুপুরে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন থেকে ৮ নম্বর বাসে ওঠেন বেসরকারি চাকরিজীবী মহিউদ্দিন। দৈনিক বাংলা মোড়ে নামার সময় তিনি ২০ টাকার নোট দিলে কন্ডাক্টর তাঁকে ৫ টাকা ফেরত দেন। কন্ডাক্টরের দাবি, সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা করা হয়েছে।
এ নিয়ে প্রতিবাদ করেন মহিউদ্দিন। তিনি জানতে চান, সরকার কখন বাসভাড়া বাড়িয়েছে। এক কিলোমিটারের কম দূরত্বের জন্য কেন ৫ টাকা বেশি দিতে হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয় এবং পরিস্থিতি হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে।
রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া
রাজধানীর সাইনবোর্ড থেকে নতুনবাজারগামী ইকবাল পরিবহণের একটি এসি বাসে ১০০ টাকার পরিবর্তে ১২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই বাসের যাত্রী ইব্রাহিম খলিল বলেন, তিনি প্রতিদিন ১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু মঙ্গলবার তাঁর কাছ থেকে ১২০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
মহাখালী থেকে বিজয় সরণি পর্যন্ত বৈশাখী ও ভূঁইয়া পরিবহণে ১০ টাকার পরিবর্তে ১৫ টাকা নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। গুলিস্তান থেকে বিমানবন্দরগামী বিভিন্ন পরিবহণেও ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়াকে কেন্দ্র করে যাত্রী ও পরিবহণকর্মীদের মধ্যে বচসা হয়েছে।
চিটাগাং রোড থেকে গুলিস্তানগামী বাসে ৫ টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও সাইনবোর্ড থেকে চলাচলকারী মৌমিতা, ঠিকানা, অনাবিল ও লাভলী পরিবহণেও গন্তব্যভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চিটাগাং রোড থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত লেগুনায় ২০ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং ২৫ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ৩০ টাকা নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের বন্ধন ও উৎসব পরিবহণেও ভাড়া বাড়ানো হয়। এই রুটে ৫৫ টাকার পরিবর্তে যাত্রীদের কাছ থেকে ৬০ টাকা নেওয়া হয়েছে। তখনো সরকার নতুন ভাড়া কার্যকর করেনি।
চট্টগ্রামেও ভাড়ানৈরাজ্যের অভিযোগ
ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম মহানগরে। সোমবার সকাল থেকে নগরীর আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, চকবাজার, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় বাস, টেম্পো ও হিউম্যান হলারে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে যাত্রী ও পরিবহণকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার পাশাপাশি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কাজীর দেউড়ি থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পথে মিনিবাসের ভাড়া ছিল ৭ টাকা। সেখানে ১৫ টাকা আদায় করা হয়েছে। কোতোয়ালি মোড় থেকে জামালখান পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ১৫ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বহদ্দারহাট থেকে নতুন সেতু পর্যন্ত বাসভাড়া ছিল ১০ থেকে ১২ টাকা। সেখানে ১২ থেকে ১৫ টাকা নেওয়া হয়েছে। একই পথে মাহিন্দ্রার ১৪ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা আদায় করা হয়েছে।
কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ৩৫ টাকার ভাড়া নেওয়া হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। বহদ্দারহাট থেকে শিকলবাহা ক্রসিং পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ভাড়া ২২ টাকা হলেও আদায় করা হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা।
পটিয়া রুটে ৫৯ টাকার ভাড়া ৭০ থেকে ৭৫ টাকা এবং কেরানীহাট পর্যন্ত ১১২ টাকার ভাড়া ১৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামের বাসযাত্রী নাসির উদ্দিন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমলেও গণপরিবহণের ভাড়া কমানো হয় না। কিন্তু দাম বাড়লেই রাতারাতি ভাড়া বেড়ে যায়। তাঁর অভিযোগ, গ্যাসচালিত গাড়িতেও ডিজেলচালিত বাসের মতো বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
দূরপাল্লার বাসেও ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি
রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন এসি ও নন-এসি বাসেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হয়েছে।
মাগুরাগামী যাত্রী মো. রমজান বলেন, আগের দিন ৫০০ টাকা দিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু ফেরার পথে একই দূরত্বের টিকিট কিনতে তাঁকে ৬০০ টাকা দিতে হয়েছে।
রংপুরগামী যাত্রী মো. রিয়াদুর রহমান জানান, কয়েক দিন আগেও তিনি ৮০০ টাকায় যাতায়াত করেছেন। এবার তাঁকে ৯০০ টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে হয়েছে। অনেক বাসে এর চেয়েও বেশি ভাড়া চাওয়া হচ্ছিল বলে জানান তিনি।
সায়েদাবাদ থেকে খুলনা, বরিশাল, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরগামী বাসে ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামগামী কোনো কোনো বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির ক্ষোভ
যাত্রীদের কাছ থেকে সিদ্ধান্তের আগেই বাড়তি ভাড়া আদায়ের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির অভিযোগ, যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব বাদ দিয়ে পরিবহণ মালিকদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহণ পরিচালন ব্যয় কতটা বেড়েছে এবং কত পয়সা ভাড়া বাড়ানো যৌক্তিক—সেই হিসাবও প্রকাশ করা হয়নি।
সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাস ও লঞ্চের ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এর একচেটিয়া সুবিধা মালিকদের দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি জানান, যাত্রীকল্যাণ সমিতি মঙ্গলবার সকালে সরকারের কাছে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ৮ পয়সা এবং সিটি সার্ভিসে ১০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। একই সঙ্গে লঞ্চের ভাড়া নটিক্যাল মাইলপ্রতি ৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। তবে সংগঠনটির অভিযোগ, সরকার তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বাস মালিকদের ইচ্ছামতো বাসভাড়া বাড়িয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম প্রত্যাহারের দাবি আইপিডির
এদিকে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, গণশুনানি, জনপরামর্শ ও অংশীজনদের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা ছাড়াই তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও প্রকাশ্যে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শেষ পর্যন্ত কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ল
সোমবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বৈঠকে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়ে যায়।
পরে মঙ্গলবার দুপুরে সরকার দূরপাল্লা ও মহানগরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের ঘটনাগুলো নতুন করে গণপরিবহণে ভাড়া নির্ধারণ, তা বাস্তবায়ন এবং তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।



