জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। সাধারণ মানুষের আয় না বাড়লেও গত কয়েক দিনে বেড়ে গেছে সংসারের ব্যয়। বাজারে চাল, সবজি, আটা-ময়দা, ভোজ্যতেলসহ অন্তত ১২টি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। কোথাও কোথাও এক-দুই দিনের ব্যবধানেই কেজিতে কয়েক টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
ফলে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ। সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন। বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য পণ্য ও সেবার ওপরও পড়তে পারে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—দুইয়ে মিলে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত তৈরি হলে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সরবরাহব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও বাজার সিন্ডিকেট ও সরবরাহব্যবস্থার নানা অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারও বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং নানা অব্যবস্থাপনা ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতায় বিভিন্ন সময়ে অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল, নতুন রাজনৈতিক সরকার বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
সরকারের পক্ষ থেকেও বাজার নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। এরপর গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং সর্বশেষ দুই দিন আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে পরিবহণসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় দেশের অন্তত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা।
অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপের আশঙ্কা
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরী বলেন, এমনিতেই পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। এর সঙ্গে আয় না বাড়া ও বেকারত্ব বৃদ্ধির বিষয়টিও রয়েছে। এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
তার মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়বে। এতে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দুই-তিন দিনেই বেড়েছে চাল, সবজি ও অন্যান্য পণ্যের দাম
মঙ্গলবার রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগের দিনের তুলনায় বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিকেজি মোটা চালের স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ টাকায়। শনিবার একই চালের দাম ছিল ৫৫ টাকা।
প্রতিকেজি বেগুন আকার ও মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১৩০ টাকায়। আগে এর দাম ছিল ৮০ থেকে ১২০ টাকা। শসা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা। শনিবার যা ছিল সর্বনিম্ন ৪০ টাকা।
কাঁচামরিচের দামেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। প্রতিকেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৬০ টাকায়। দুই দিন আগে এর সর্বনিম্ন দাম ছিল ৮০ টাকা।
প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকায়, যা আগে ছিল ১৫০ টাকা। আমদানি করা রসুনের দাম বেড়ে হয়েছে প্রতিকেজি ১৮০ টাকা। আগে তা বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকায়।
এ ছাড়া খুচরা পর্যায়ে বড় দানার মসুর ডাল প্রতিকেজি ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৯০ থেকে ১০০ টাকা। খোলা আটা কেজিপ্রতি ৫০ টাকা, আগে ছিল ৪৮ টাকা। খোলা ময়দার দাম বেড়ে হয়েছে ৭০ টাকা, যা আগে ছিল ৬৫ টাকা।
খোলা পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৭০ টাকায়। আগের দিনও এর দাম ছিল ১৬৬ টাকা। প্যাকেটজাত তরল দুধের দামও বেড়েছে। প্রতিলিটার বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা, যা আগে ছিল ১০০ টাকা।
পরিবহণ খরচ বাড়ায় বাড়ছে পণ্যের দাম
বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মশিউর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহণ ভাড়াও বেড়েছে। ফলে নতুন করে যেসব পণ্য বাজারে আনতে হচ্ছে, সেগুলোর দাম বাড়ছে। তবে আগে আনা পণ্যগুলোর দাম এখনো অনেক ক্ষেত্রে বাড়েনি।
ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির যুগান্তরকে বলেন, তেল সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির সময় এক দফায় ট্রাকের ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। তিন দিন আগেও বগুড়া থেকে ঢাকায় একটি ট্রাক আসতে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা ভাড়া লাগত। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এখন আরও ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
‘মনে হচ্ছে একটা সময় না খেয়ে মরতে হবে’
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পড়েছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় রাজধানীর কাওরান বাজারে আসা ভ্যানচালক কামরুল হাসানের কথায়।
মঙ্গলবার দুপুর ১টা ১৭ মিনিটে প্যাডেলচালিত তিন চাকার ভ্যানে শিকল দিয়ে তালা লাগিয়ে নিত্যপণ্য কিনতে কাওরান বাজারে আসেন তিনি। প্রায় ৩০ মিনিট বাজার ঘুরেও শেষ পর্যন্ত কিছু কিনতে পারেননি।
কামরুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, গতকাল ভোররাত থেকে পণ্য পরিবহণ করে তিনি ৬৬৫ টাকা আয় করেছেন। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন ভ্যান নিয়ে বের হতে পারেন। এই আয়ের মধ্য থেকেই ভ্যানের মালিককে জমা দিতে হয়। একই সঙ্গে পরিবারের পাঁচ সদস্যের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়।
তার ভাষায়, বাজারে পণ্যের দাম এমনিতেই বেশি। শুক্রবার বাজার করতে এসে এখন আবার দেখছেন অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে, তাই পণ্যের দামও বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় না খেয়ে মরতে হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বেতনেও মাসের খরচ মেলাতে পারছেন না মধ্যবিত্ত
রাজধানীর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকার বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার মাসিক বেতন ৩৩ হাজার টাকা। মা, স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে তার চার সদস্যের সংসার।
পরিবারের জন্য মাসে ৫০ কেজির এক বস্তা চাল কিনতে প্রায় ৩ হাজার টাকা, পাঁচ লিটার তেলে ১ হাজার টাকা, বাসাভাড়ায় ১০ হাজার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল বাবদ ২ হাজার টাকা খরচ হয়।
সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ তরকারি ও রান্নার উপকরণে মাসে প্রায় ৭ হাজার টাকা, সাবান-ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পুতে ৭০০ টাকা, মুদিবাজারে আরও ২ হাজার টাকা এবং মোবাইল টকটাইম ও ইন্টারনেট বিল বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় হয়।
এর সঙ্গে সন্তানের শিক্ষাব্যয় ৭ হাজার, পরিবারের যাতায়াত খরচ ৫ হাজার এবং মাসে গড়ে চিকিৎসা ব্যয় ২ হাজার টাকা ধরলে তার মোট মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৬০০ টাকা।
অর্থাৎ ৩৩ হাজার টাকা বেতন পাওয়ার পরও প্রতি মাসে অন্তত ১ হাজার ৬০০ টাকা ঘাটতি থাকে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, বেতন দিয়ে মাস চালাতে পারছেন না। এরই মধ্যে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। প্রতিমাসে আয়-ব্যয়ের ঘাটতি সামাল দিতে ঋণ করতে হচ্ছে।
‘বাড়তি ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে’
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণাই মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। কারণ তেলের দাম শুধু পরিবহণ ব্যয়ই বাড়ায় না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে।
তার মতে, শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়বে। আর সেই বাড়তি ব্যয়ের শেষ বোঝা সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পণ্যের দাম যতটা বাড়ার কথা, অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে কারসাজি করে তার চেয়ে বেশি দাম বাড়াতে না পারে, সে বিষয়ে তদারকি সংস্থাগুলোকে নজরদারি বাড়াতে হবে।
সরকার বলছে, মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সীমিত থাকবে
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না। তেলের দাম বাড়ার প্রভাব যাতে অন্য পণ্যের দামে না পড়ে, সেজন্য সরবরাহব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য যে অভিঘাত তৈরি হতে পারে, তা কীভাবে কমানো যায়, সে জন্য সরকার কাজ করছে। মূল্য স্থিতিশীল থাকবে এবং দামের ওপর তেমন লক্ষণীয় কোনো অভিঘাত আসবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রাথমিক ধাক্কা ইতোমধ্যেই নিত্যপণ্যের বাজারে দৃশ্যমান। পরিবহণ ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার তদারকিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে আগামী দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন ভোক্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।



