ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধের কোনো সুস্পষ্ট সমাপ্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সংঘাতকে একসময় ‘ছোট্ট অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, তা এখন তার প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান আত্মসমর্পণ করেনি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং যুদ্ধ শেষ করার কোনো পরিষ্কার পথও এখনো তৈরি হয়নি।
ইরানের ওপর সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত রেখে যুক্তরাষ্ট্র ফের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে হাঁটছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্র দেশগুলোকে জানিয়েছেন, ‘আপাতত’ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা কম।
ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের প্রভাবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে যুদ্ধের ছয়টি বড় পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো—
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস
রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্পের অনুমোদন হার ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও চাপের মুখে পড়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতের পক্ষে সমর্থন রয়েছে মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষের। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়টি রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা
পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ পরিবহন করা হয়। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমেছে। তবে যুদ্ধ নিয়ে শুরুতে যে ধরনের বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হয়েছিল, বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত তার তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত, তবে পরাজিত নয় ইরান
ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে দেশটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। এখনো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে তেহরানের। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা
যুদ্ধের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর প্রভাব তেল ও গ্যাসের দামের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যেও পড়ছে।
কূটনৈতিক সমাধানের চাপ বাড়ছে
দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের চাপ তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা
ছয় মাসের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ইরান ও ইসরায়েলের সরাসরি সংঘাতের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে এর প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান না হলে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



