পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। নদতীর ঘেঁষে শহর রক্ষা বাঁধ। বাঁধের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গাছের সারি তৈরি করেছে ঘন সবুজের আবরণ। পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এলেও তীব্র গরম যেন এই ছায়াঘেরা পরিবেশে খুব একটা পৌঁছাতে পারে না। এমন নিরিবিলি ও শান্ত পরিবেশের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতল একটি ভবন। ভেতরে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্মৃতি, তাঁর শিল্পকর্ম, ব্যবহৃত সামগ্রী ও শিল্পজীবনের নানা নিদর্শন।
ময়মনসিংহ নগরের জিরো পয়েন্ট থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় ঘেঁষা সড়ক ধরে প্রায় দেড় কিলোমিটার এগোলেই দেখা মেলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালার। এটি কেবল শিল্পকর্ম প্রদর্শনের স্থান নয়; ময়মনসিংহের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে গভীর সম্পর্ক।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহে জন্ম নেওয়া জয়নুল আবেদিনের শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় কেটেছে ব্রহ্মপুত্রের তীরে। নদ, প্রকৃতি ও গ্রামীণ মানুষের জীবন তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানেই তাঁর শিল্পকর্ম ও স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় সংগ্রহশালাটি। তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এর উদ্বোধন করেন। দীর্ঘদিন স্থানীয় প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হওয়ার পর ১৯৯৯ সাল থেকে এটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সংগ্রহশালার দ্বিতল ভবনের নিচতলায় রয়েছে দাপ্তরিক কার্যক্রম। ভবনের কিছু অংশে পুরোনো হওয়ার ছাপও স্পষ্ট। কোথাও দেয়ালের রং উঠে গেছে, আবার কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে। তবে ওপরের তলার দুটি গ্যালারি তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এসব গ্যালারিতে সযত্নে সাজিয়ে রাখা হয়েছে জয়নুল আবেদিনের আঁকা ছবি এবং তাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী।
বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে সংগ্রহশালায় রয়েছে ১৮৯টি নিদর্শন। এর মধ্যে ৬২টি শিল্পকর্ম এবং ১২৭টি ব্যক্তিগত স্মৃতিনিদর্শন। প্রথম গ্যালারিতে রয়েছে ‘মনপুরা ৭০’, ‘জীবন সংগ্রাম’, ‘দুটি মুখ’সহ শিল্পীর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি চিত্রকর্ম। একই গ্যালারিতে রাখা হয়েছে তাঁর ছবি আঁকার সরঞ্জাম, চারকোল, জুতা, পোশাকসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত সামগ্রী।
দ্বিতীয় গ্যালারিতে রয়েছে দুর্ভিক্ষ সিরিজের পাঁচটি আলোচিত চিত্রকর্মসহ মোট ৩৩টি শিল্পকর্ম। পাশাপাশি রাখা হয়েছে শিল্পীর ব্যবহৃত পোশাক ও অন্যান্য স্মৃতিনিদর্শন। তাঁর সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন ও ছেলে মঈনুল আবেদিন পরবর্তীতে কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রী সংগ্রহশালায় দান করেন। শিল্পীর সার্টিফিকেট, হাতঘড়ি, ব্যবহৃত খাট, চারকোল, জুতা, স্যুট, গেঞ্জি, মাফলারসহ নানা স্মৃতিচিহ্নও দর্শনার্থীদের সামনে প্রদর্শিত হচ্ছে।
সংগ্রহশালার উপ-কীপার মুকুল দত্ত বলেন, ‘এই সংগ্রহশালা ময়মনসিংহবাসীর একটি প্রাণের প্রতিষ্ঠান। আমরা সব সময় এটি গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করি। শিল্পীর আঁকা ছবি ও স্মৃতিনিদর্শনগুলো যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি দর্শনার্থীরা এখানে এসে যেন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।’
দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য সংগ্রহশালায় নামাজের স্থান, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও মাতৃদুগ্ধপানের সুবিধা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিনা টিকিটে সংগ্রহশালা পরিদর্শনের সুযোগ। প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত প্যাডে আবেদন করলে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ সুবিধা পেয়ে থাকেন।
শুধু শিল্পকর্ম প্রদর্শন নয়, শিল্পচর্চার সঙ্গেও সংগ্রহশালাটির রয়েছে সরাসরি যোগাযোগ। জয়নুল আবেদিনের ইচ্ছায় ১৯৮০ সালের দিকে এখানে আর্ট স্কুল চালু করা হয়। বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা এবং শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের ছবি আঁকা শেখানো হয়। প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এ দশ বছর মেয়াদি কোর্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে প্রতি বছর জানুয়ারিতে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভর্তি নেওয়া হয়। বর্তমানে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
মুকুল দত্ত বলেন, ‘এটা জয়নুল আবেদিনের ইচ্ছা ছিল। আমরা নিয়মিতভাবে কার্যক্রমটি পরিচালনা করে যাচ্ছি। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও সংগ্রহশালার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছি।’
গ্যালারিতে সংরক্ষিত জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্ম এখন আর শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; নতুন প্রজন্মের শিল্পচর্চারও অনুপ্রেরণা। শিশু-কিশোরদের হাতে তুলির আঁচড়ের মধ্য দিয়ে এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের শিল্পী।
সংগ্রহশালার আকর্ষণ যে শুধু ময়মনসিংহবাসীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রমাণ গত অর্থবছরের দর্শনার্থীর পরিসংখ্যান। ওই বছরে মোট ৩৪ হাজার ৮৮৫ জন সংগ্রহশালাটি পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে দেশি দর্শনার্থী ছিলেন ২৮ হাজার ৯৩৬ জন, শিশু ৪ হাজার ৩৭০ জন, সার্কভুক্ত দেশের চারজন এবং অন্যান্য বিদেশি দর্শনার্থী ১ হাজার ৪৫৯ জন। এ ছাড়া সৌজন্য দর্শনার্থী হিসেবে বিনা মূল্যে প্রবেশ করেছেন আরও ১ হাজার ৫৬১ জন।
জার্মান প্রবাসী জেসিকা জোসনা সংগ্রহশালা ঘুরে বলেন, ‘ছোটবেলায় জয়নুল আবেদিনের অনেক গল্প পড়েছি। দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো দেখলে এখনো গা শিউরে ওঠে। ময়মনসিংহে এসে এত সুন্দর একটি সংগ্রহশালা না দেখে গেলে আফসোস থেকে যেত।’
খুলনা থেকে আসা এক দর্শনার্থী বলেন, ‘পরিবেশটা অনেক সুন্দর। ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। কর্মরতরা বিষয়টি আন্তরিকভাবে বুঝিয়ে বলেছেন। নিরাপত্তার ব্যবস্থাটিও ভালো লেগেছে।’
সংগ্রহশালার উপ-কীপার মুকুল দত্ত জানান, বর্তমানে আনসার সদস্যসহ মোট ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, গ্যালারির শৃঙ্খলা, শিল্পকর্মের পরিচর্যা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তারা কাজ করছেন। সংগ্রহশালার ভেতরে ছবি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দায়িত্বে থাকা কর্মীরা দর্শনার্থীদের বিষয়টি জানিয়ে দেন। প্রবেশপথেও দর্শনার্থীদের সহযোগিতার জন্য কর্মী দায়িত্ব পালন করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, গ্যালারির পরিবেশ বেশ শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত। শিল্পকর্মের খুব কাছাকাছি যেতে না দেওয়া, ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা এবং দর্শনার্থীদের চলাচল পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। ময়মনসিংহ ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরাও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করেন।
ময়মনসিংহ ট্যুরিস্ট পুলিশের এসআই জামিল বলেন, ‘সংগ্রহশালায় আসা দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সেদিকে আমরা নজর রাখি। সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তথ্য, পরামর্শসহ বিভিন্নভাবে দর্শনার্থীদের সহায়তা করি। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’
তবে বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্ব বোঝাতে সংগ্রহশালার অতীতের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৮২ সালে এখান থেকে ১৭টি মূল্যবান চিত্রকর্ম চুরি হয়েছিল। দীর্ঘ ১২ বছর পর ১৯৯৪ সালে পুলিশের অভিযানে ১০টি চিত্রকর্ম উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বাকি সাতটি আর উদ্ধার হয়নি। জাতীয় শিল্প-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হারিয়ে যাওয়ার ওই ঘটনা এখনো সংগ্রহশালার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে আছে।
সেই অভিজ্ঞতার কারণে বর্তমানে শিল্পকর্ম সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী অবস্থানের কারণে আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও পরিবেশগত নানা বিষয় শিল্পকর্ম সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্যালারিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ব্রহ্মপুত্রের তীরে তাই জয়নুল সংগ্রহশালা শুধু একটি জাদুঘর নয়, এটি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্মৃতি, ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নদীর স্রোত বদলায়, সময় এগিয়ে যায়; কিন্তু এই সংগ্রহশালা নীরব সাক্ষী হয়ে ধরে রেখেছে এক মহান শিল্পীর জীবন, সৃষ্টিশীলতা ও শেকড়ের গল্প।



