সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় বনফুল অ্যান্ড কোম্পানির তাজপুর শাখার এক কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ মে ঈদের পরদিন বিকেলে নিজের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ ক্রেতার বেশে তাজপুরের বনফুল শাখায় যান ইউএনও মুনমুন নাহার আশা। সে সময় শাখা ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া দোকানের বাইরে ছিলেন।
দোকানে প্রবেশ করে ইউএনও চকোলেট আইসক্রিম চাইলে কর্মচারী আব্দুল মান্নান জানান, ওই স্বাদের আইসক্রিম নেই, তবে অন্য ধরনের আইসক্রিম পাওয়া যাবে। পরে ইউএনও মিষ্টির কাউন্টারে গিয়ে বিভিন্ন মিষ্টি সম্পর্কে জানতে চাইলে আব্দুল মান্নান বলেন, ঈদের কারণে নতুন মিষ্টি আসেনি এবং সেদিনের অধিকাংশ মিষ্টিও বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, কাউন্টারে থাকা মিষ্টিগুলো শুকনো হওয়ায় কয়েক দিন ভালো থাকে।
এ সময় আব্দুল মান্নান ইউএনওকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করলে তিনি ক্ষুব্ধ হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আব্দুল মান্নানের দাবি, ইউএনও তাকে বলেন, “তুমি আমাকে চিনো? আমাকে আপা ডাকছ কেন? আমি ম্যাজিস্ট্রেট।” একই সঙ্গে বাসি মিষ্টি বিক্রির অভিযোগের কথা উল্লেখ করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথাও জানান।
পরে ইউএনও শাখা ব্যবস্থাপককে ডাকার নির্দেশ দেন। কর্মচারীরা জানান, ব্যবস্থাপক বাইরে রয়েছেন। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন আব্দুল মান্নান।
তার ভাষ্য, পুলিশি হয়রানি ও মানসিক চাপে তিনি একপর্যায়ে দোকান থেকে বের হয়ে যান। পরে শাখা ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া এসে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্ষমা চান। এরপর আব্দুল মান্নানকে ডেকে এনে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
আব্দুল মান্নানের অভিযোগ, তিনি প্রথমে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। তবে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও আরও বেশি জরিমানার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
গত ১ জুন জরিমানার পরিমাণ কমানোর অনুরোধ জানাতে তিনি ইউএনও কার্যালয়ে যান। সেখানে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন বলে জানান তিনি। সে সময় উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তার আবেদন গৃহীত না হওয়ায় পরে তিনি সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন।
আব্দুল মান্নান বলেন, “আমি ২৬ বছর ধরে বনফুলে চাকরি করছি। চাকরি জীবনে নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু এমন ঘটনার সম্মুখীন কখনও হইনি।”
তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের হস্তক্ষেপে তার চাকরি বহাল থাকে। বর্তমানে তাকে বনফুলের সিলেট কারখানায় বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকার জরিমানার অর্থ তার বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে বলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে শাখা ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়াকে পূর্বনির্ধারিত বক্তব্য দিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস.টি.এম. ফখর উদ্দিন বলেন, “ভুক্তভোগী ব্যক্তি বিষয়টি সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন। তবে ঘটনার বিস্তারিত জানতে ইউএনওর বক্তব্য নেওয়াই সমীচীন হবে।”
বনফুল তাজপুর শাখার ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া বলেন, “আমাদের কর্মচারী বয়স্ক ও নিরক্ষর। ক্রেতার বেশে ইউএনও এসেছিলেন, বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেননি। এ কারণে ইউএনও তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে জরিমানা করেন।”
এ বিষয়ে বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, “আমি বা আমার কোনো স্টাফ মিষ্টি কিনতে যেতে পারি। ওসমানীনগর ইউএনও আমার সহকর্মী। তিনি শুধু ‘আপা’ বলে সম্বোধন করার কারণে জরিমানা করবেন বলে মনে হয় না। হয়তো অন্য কোনো অনিয়ম পাওয়ায় জরিমানা করেছেন।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



