tanaka

জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে উন্নত দেশগুলোকে আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য তহবিল পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন...
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকবিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মুসলিমদের নীরব বঞ্চনা -দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মুসলিমদের নীরব বঞ্চনা -দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

যুক্তরাজ্যের মধ্য ওয়েলসের স্যাঁতসেঁতে পাহাড়ি অঞ্চলে হামিশ উইলসনের একটি শান্ত, মনোরম খামারবাড়ি রয়েছে। অতিথিপরায়ণতা, কফি বানানো আর গল্প করার জন্য তার বেশ সুনাম। প্রতি গ্রীষ্মে এখানে কয়েক শ সোমালি মানুষ জড়ো হন। এটি নিছক কোনো অবকাশযাপন নয়; বরং একটি মানবিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। সোমালি সংস্কৃতি উদ্‌যাপন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার বাবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা এক সোমালি সহযোদ্ধার স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই এই আয়োজনের সূচনা।

কিন্তু আয়োজকেরা তখনো বুঝতে পারেননি—এই ছোট উদ্যোগ একদিন বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার গভীর এক বৈষম্যকে নগ্নভাবে সামনে এনে দেবে। এমন এক বৈষম্য, যা শুধু একটি ছুটির আনন্দ নষ্ট করছে না; বরং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে ধীরে ধীরে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।

এই গল্পের শিকড় ১৯৪০ সালে। তখন ২৭ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন এরিক উইলসন ব্রিটিশ উপনিবেশ সোমালিল্যান্ডে ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত অবস্থায়ও তিনি অল্প কয়েকজন সোমালি সহযোদ্ধাকে নিয়ে টানা পাঁচ দিন ইতালীয়দের ভারী কামান হামলা প্রতিরোধ করেন। অবশেষে অবস্থান পতনের পর তাকে মৃত ধরে মরণোত্তর ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’—ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান—প্রদান করা হয়। কয়েক মাস পর যুদ্ধবন্দী শিবির থেকে তার জীবিত ফিরে আসা ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর ঘটনা।

তবে এই সম্মান সারাজীবন এরিক উইলসনের মনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে রেখেছিল। তিনি ভাবতেন—তিনি পুরস্কার পেলেন, অথচ তার সার্জেন্ট ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু সোমালি যোদ্ধা ওমর কুজুগের মতো মানুষরা কেন ইতিহাসের আড়ালেই থেকে গেলেন?

এই আফ্রিকাপ্রীতি ও দায়বোধ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন তার ছেলে হামিশ উইলসন। তিনি নিজেও দীর্ঘ সময় পূর্ব আফ্রিকায় কাটিয়েছেন। উইলসন ও তার বন্ধুরা—যাদের মধ্যে ওমর কুজুগের সন্তান ও নাতি-নাতনিরাও ছিলেন—খেয়াল করেন, যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা তরুণ সোমালিরা ধীরে ধীরে নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। গণমাধ্যমে নেতিবাচক উপস্থাপনার কারণে তারা নিজেদের দেশ সম্পর্কে কেবল দুঃখজনক গল্পই জানছে।

এই উপলব্ধি থেকেই ২০১০ সালে, এরিক উইলসনের মৃত্যুর আগে তার পাওয়া ভিক্টোরিয়া ক্রস বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেই অর্থে কেনা হয় খামারবাড়িটি, যেখানে গড়ে তোলা হয় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র—‘দেগমো’। সোমালি ভাষায় এর অর্থ যাযাবর পশুপালকদের তাবু।

প্রতি গ্রীষ্মে সোমালি পরিবারগুলো এখানে আসে। তারা তাবু খাটায়, বনের ভেতর হাঁটে, রাতে খোলা আকাশের নিচে তারার দিকে তাকিয়ে থাকে। বয়স্করা নাতি-নাতনিদের ছাগলের দুধ দোহানো শেখান, শোনান জীবনের গল্প। খরচ চালাতে অতিথিরা উইলসনের দাতব্য তহবিলে সামান্য অনুদান দেন।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল—যতক্ষণ না ব্যাংকিং জটিলতা শুরু হয়।

উইলসনের ভাষায়, ‘ব্যাংক প্রায়ই ফোন করে আমার অ্যাকাউন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলে। প্রতিবার একই ব্যাখ্যা দিতে হয়। আমি বলি—কয়েক সপ্তাহ আগেই তো সব জানিয়েছি। তবু তারা আধা ঘণ্টা সময় নষ্ট করবেই।’

তবে তার চেয়েও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন সোমালি অতিথিরা। বার্মিংহামের এক সোমালি নারী জানান, কয়েক ডজন মানুষের এই সফরের আয়োজন করতে গিয়ে তাকে রীতিমতো মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সবাই তার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতেন, আর সেখান থেকে তিনি থাকা-খাওয়ার খরচ মেটাতেন।

মাত্র তিন মাসে—জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—তার অ্যাকাউন্টে প্রায় ৪ হাজার পাউন্ড লেনদেন হওয়াতেই ব্যাংক তাকে তলব করে। প্রতিটি লেনদেনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়—কে টাকা পাঠিয়েছে, কী সম্পর্ক, টাকার উৎস কী। তার মনে হচ্ছিল, যেন তিনি কোনো গুরুতর অপরাধে জড়িত।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। সোমালিয়ায় আত্মীয়দের কাছে যাওয়ার জন্য বোনের অ্যাকাউন্টে বিমান টিকিটের টাকা পাঠালে সেটিও আটকে দেওয়া হয়। বন্ধুদের সঙ্গে গড়া সঞ্চয় সমিতির অর্থও ব্যাংক ফ্রিজ করে দেয়।

সন্দেহের মাত্রা ছিল অবিশ্বাস্য। লেনদেনের নোটে ইংরেজির বদলে সোমালি ভাষা ব্যবহার করলেই ট্রান্সফার বন্ধ হয়ে যেত। ২৫০ পাউন্ডের বেশি হলেই কৈফিয়ত। ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ দিন হলো যেদিন আমাকে ব্যাংকে যেতে হয়।’

এই মানুষগুলো সবাই ব্রিটিশ নাগরিক। তবু কেন তাদের সঙ্গে এমন আচরণ? হিজাবের কিনারে আঙুল বুলিয়ে সেই নারী বলেন, ‘আমি ব্রিটিশ কি না, সেটাই আসল নয়। আমি গরিব, আর আমি মুসলিম—এই পরিচয়টাই যথেষ্ট।’

বাস্তবতা হলো, তারা কৃষ্ণাঙ্গ ও মুসলিম। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর সন্ত্রাসী অর্থায়ন ঠেকাতে যে বৈশ্বিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে এই জনগোষ্ঠী। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে প্রণীত কঠোর নিয়মগুলো ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেয়। ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়—সন্দেহজনক লেনদেন দেখলেই সরকারকে জানাতে হবে, নইলে বড় অঙ্কের জরিমানা।

সমস্যা ছিল নীতিগত। মানি লন্ডারিং মানে কালো টাকা সাদা করা, আর সন্ত্রাসে অনেক সময় ব্যবহৃত হয় বৈধ অর্থ। তাহলে ব্যাংক কীভাবে নিশ্চিত হবে, কে ভবিষ্যতে কী করবে? আইএমএফের আইনজীবী রিচার্ড গর্ডন তখনই সতর্ক করেছিলেন—এই দায়িত্ব ব্যাংকের কাঁধে চাপানো অবাস্তব। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষিতই থেকে যায়।

২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আরব ব্যাংকের বিরুদ্ধে রায় ব্যাংকগুলোর আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। হামাস তখন বৈধ সংগঠন হলেও অ্যাকাউন্ট পরিচালনার দায়ে ব্যাংককে জরিমানা গুনতে হয়। ২০০২ সালে এফএটিএফ আরেকটি বিতর্কিত ইঙ্গিত দেয়—বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য চ্যারিটির নামে অর্থ সংগ্রহ সন্দেহজনক হতে পারে। এরপর থেকেই মুসলিম পরিচালিত সংস্থাগুলোর অ্যাকাউন্ট বন্ধের হিড়িক পড়ে, যা পরিচিত হয় ‘ডিব্যাঙ্কিং’ নামে।

২০২২ সালের এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ শতাংশের বেশি মুসলিম কোনো না কোনো ব্যাংকিং সমস্যার মুখে পড়েছেন—শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। যুক্তরাজ্যে ২০১৪ সালে এইচএসবিসি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বহু মুসলিম সংগঠনের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়; আপিলের সুযোগও ছিল না।

এর পরিণতি ভয়াবহ। দান বন্ধ হয়ে যায়, সামাজিকভাবে লজ্জা ও সন্দেহের ছায়া নেমে আসে। একবার নাম তালিকাভুক্ত হলে অন্য ব্যাংকও দূরে থাকে।

প্রতিবেদক নিজে সন্ত্রাসের নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন। তবু তার প্রশ্ন—নিরপরাধ মানুষকে সমাজচ্যুত করে কি সত্যিই সন্ত্রাসবাদ ঠেকানো যায়? লন্ডন সোমালি ইয়ুথ ফোরামের পরিচালক মোহামেদ ইব্রাহিম সোজাসাপটা বলেন, ‘এটাকে কি বর্ণবাদ বলা যায় না?’

ব্যাংকগুলো অবশ্য তা স্বীকার করে না। তারা ‘অ্যাডভার্স নিউজ’ সফটওয়্যারের যুক্তি দেয়—নামের মিল থাকলেই ঝুঁকি এড়াতে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়। অথচ ২০০৭ সালে এফএটিএফ নিজেই বলেছিল, নামের ভিত্তিতে নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে।

তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ব্যাংকের কাছে সন্ত্রাসের চেয়েও বড় ঝুঁকি তাদের জরিমানা। যাচাই-বাছাইয়ের ঝামেলার চেয়ে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করাই তাদের কাছে সহজ ও লাভজনক। ২০১৬ থেকে ২০২২—এই ছয় বছরে যুক্তরাজ্যে বছরে অ্যাকাউন্ট বন্ধের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৩ হাজারে।

ধনীদের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। নাইজেল ফারাজ বা অস্ত্র ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ করলে নীতি বদলায়। কিন্তু বার্মিংহামের সেই সোমালি নারী কিংবা খামারের সেই বৃদ্ধাদের কণ্ঠ কেউ শোনে না।

ফলে ব্যাংকগুলো কার্যত পুলিশের ভূমিকা পালন করছে—তবে তারা নিশানা করছে মূলত তাদেরই, যাদের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই।