মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির আলোচনা যখন জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রতি নিজেদের দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। একইসঙ্গে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।
চলমান আঞ্চলিক যুদ্ধ চতুর্থ মাসে প্রবেশ করেছে। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো শান্তি চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মার্চের শুরুতে নতুন করে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তেহরানের প্রতি সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবেই তারা এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
লেবাননের টেলিভিশন চ্যানেল আল-মায়াদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, লেবাননের যুদ্ধ বন্ধ না হলে সামগ্রিক সংঘাতেরও অবসান হবে না। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনীকে দখলকৃত এলাকা ছেড়ে যেতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম প্রত্যাখ্যান করার পরই আরাগচির এ বক্তব্য আসে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং হিজবুল্লাহকেও আলোচনায় রাখা হয়নি।
এদিকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তেল আবিব জানিয়েছে, তারা অভিযান বন্ধ করবে না এবং সেনা প্রত্যাহারও করবে না। এর জবাবে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক বোফোর্ট ক্যাসেল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মহসেন রেজায়েই বলেন, হিজবুল্লাহ তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং সংগঠনটির প্রতি ইরানের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। একইসঙ্গে তিনি বৈরুতে নতুন হামলার ইসরায়েলি হুমকির সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি জানিয়েছেন, ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ড ত্যাগ করলে দক্ষিণাঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা সম্ভব। তবে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইরানের সমালোচনা করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে লেবাননকে ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ সপ্তাহে গাজা, উত্তর ইসরায়েল ও কুয়েতেও হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমেছে।
নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে ওমান সাগরেও। ইরান দাবি করেছে, বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কার সুরক্ষায় তারা একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে ওমানের মিনা আল ফাহাল তেল টার্মিনালে ড্রোন হামলার কারণে সাময়িকভাবে তেল লোডিং কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে আগে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরান নিষেধাজ্ঞা শিথিল, আটকে থাকা তেল বিক্রির অর্থ ফেরত এবং বন্দর অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
এ প্রসঙ্গে ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদ-রেজা হাজি বাবাই বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইরানের বৈধ অধিকার এবং দেশটির কৌশলগত শক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো হরমুজ প্রণালী।
সূত্র: রয়টার্স



